নির্ধারিত সময়েই পরিশোধ করুন

সম্পাদকীয়

প্রতিবছরই ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। অধিকাংশ মালিক ঈদের আগে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করে থাকেন। আবার কিছু কারখানাকে ঘিরে শ্রমিক অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এবার আসন্ন ঈদুল ফিতর সামনে রেখে দেশের শিল্পকারখানার শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধের বিষয়ে সরকার একটি নির্দেশনা দিয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৯ মার্চের মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন এবং ১২ মার্চের মধ্যে বোনাস দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ–সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্তও একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। আমরা আশা করব, কারখানার মালিকেরা সরকারের নির্দেশনা মেনে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করবেন।

প্রতিবছরই একাধিক কারখানার শ্রমিকেরা বেতন-বোনাসের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। দেশে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে সবচেয়ে বড় উৎসব সামনে রেখে শ্রমিক বঞ্চনা ও অসন্তোষ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটি জাতির জন্য লজ্জাজনকই বলতে হবে। যে শ্রমিকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে জোরালো ভূমিকা রাখেন, তাঁদের ঈদযাত্রা ও উৎসব উদ্‌যাপনে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হোক আমরা চাই না।

দুঃখজনক হচ্ছে, এ বছরও শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখনো ১৮০টি পোশাক কারখানা বেতন-বোনাস পরিশোধ না করার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তিন শতাধিক কারখানা জানুয়ারি মাসের বেতনই পরিশোধ করতে পারেনি। ফলে নির্দেশনা দিয়েই সরকারের দায়িত্ব শেষ নয়। কারখানার মালিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

পোশাক খাতের মালিকপক্ষ বৈশ্বিক মন্দা, রপ্তানি আয়ের নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি এবং তারল্যসংকটের কথা বারবার বলে আসছেন। তাঁদের এই সংকটের কথা বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংক সচল রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর জন্য এক মাসের বেতন সমপরিমাণ সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এটি মালিকপক্ষের জন্য একটি বড় সুযোগ। সরকারের পক্ষ থেকে এই আর্থিক সহায়তার পর এখন আর বেতন-ভাতা আটকে রাখার কোনো যৌক্তিক অজুহাত থাকতে পারে না। ঋণের অর্থ যেন সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে যায়, সেই শর্তটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়; এতে মধ্যস্বত্বভোগী বা স্বচ্ছতার অভাব দূর হবে।

শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসে উন্নীত করা এবং রেশনের মতো মানবিক দাবিগুলোও টেবিলে রয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তবে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সময়মতো পাওনা পরিশোধ। মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের টানাপোড়েন যেন জাতীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি এই তৈরি পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল না করে।

আমরা মনে করি, নির্দেশনার বাইরে সরকারের আরও দায়িত্ব রয়েছে। যেসব কারখানা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, সেগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কোনো অবস্থাতেই যেন শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার জন্য ঈদের আগে রাজপথে নামতে না হয়। মালিকপক্ষকে মনে রাখতে হবে, এসব শ্রমিকই তাঁদের সারা বছরের ব্যবসা সচল রাখেন। ফলে শ্রমিকদের ঈদের আনন্দ নিশ্চিত করা তাঁদের দায়িত্ব। এটি শ্রমিকদের অধিকার। অন্যদিকে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন সহজ শর্তের এই ঋণসুবিধা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও সচল কারখানাই পায়।

উৎসবের আনন্দ কেবল মালিক বা উচ্চবিত্তের জন্য নয়; তা যেন কারখানার সাধারণ শ্রমিকের ঘরেও সমানভাবে পৌঁছায়। একটি শান্তিপূর্ণ ও স্বস্তির ঈদের জন্য মালিক, শ্রমিক ও সরকার—তিন পক্ষকেই সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।