উচ্ছেদের পর ফের চালু করতে দেওয়া যাবে না 

খুলনার পাইকগাছার চাঁদখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ ইটভাটা ও কাঠভিত্তিক কয়লার চুল্লি উচ্ছেদ করেছিল প্রশাসন। অবৈধ ওই স্থাপনাগুলো ছিল প্রাণ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তবে প্রথম আলোর খবরে এসেছে, উচ্ছেদ করা অবৈধ স্থাপনা মেরামত করে সেখানে আবারও শুরু হয়েছে চুল্লির কাজ। ফলে এই ধরনের অভিযানের স্থায়িত্ব ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

চাঁদখালী অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনহীনভাবে কয়লার চুল্লি ও ইটভাটা চলেছে। প্রশাসনের অভিযানে ছিল ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে স্থানীয় মানুষের বক্তব্যে যে বাস্তবতা উঠে এসেছে, তা বেশ উদ্বেগের। শ্রমিকেরা জানেন কাজটি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ধোঁয়া আর ছাইয়ের মধ্যে কাজ করলে শরীর দ্রুত সক্ষমতা হারায়। তবু বিকল্প আয়ের পথ না থাকায় তাঁরা এ কাজেই ফিরে যেতে বাধ্য হন। ভাঙা চুল্লির পাশে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ বলছেন, আবার এখানেই কারখানা হবে। এই কথার ভেতর আছে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তি। 

পরিবেশের ক্ষতির চিত্রও স্পষ্ট। প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ কাঠ পোড়ানো হয়েছে। এতে বায়ুদূষণ বেড়েছে। আশপাশে ফসলের ফলন কমেছে। শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ বাড়ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন। এর পাশাপাশি কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ কেটে মাটি নেওয়ার ফলে নদী ও বাঁধের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব কর্মকাণ্ড শুধু পরিবেশ নয়, জননিরাপত্তাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আশপাশে স্কুল, মাদ্রাসা থাকার পরও এই অবৈধ স্থাপনা দীর্ঘদিন টিকে কীভাবে ছিল—এই প্রশ্ন প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করে।

আরেকটি বাস্তবতা হলো, অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসূত্রের অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগে অভিযান হলেও তা নিয়মিত ছিল না। অভিযানের নামে কিছু অবকাঠামো ভেঙে ছবি তুলে চলে যাওয়ার নজির রয়েছে। ফলে ভাঙা স্থাপনা আবার গড়ে উঠেছে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে একের পর এক অভিযান কেবল সাময়িক স্বস্তি দেবে; দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে না।

এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন ধারাবাহিক ও সমন্বিত উদ্যোগ। নিয়মিত নজরদারি ছাড়া উচ্ছেদ কার্যক্রম অর্থহীন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা জরুরি। শুধু নিষেধাজ্ঞা আর উচ্ছেদ দিয়ে সমস্যার মূল সুরাহা হয় না। পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের জীবিকা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না আনলে অবৈধ কর্মকাণ্ড অন্য রূপে ফিরে আসবে। 

পাইকগাছার অভিযানের ঘোষিত লক্ষ্য যদি সত্যিই পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষা হয়, তবে সেটি কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করতে হবে। ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এ ধরনের অভিযান অর্থবহ হবে। নইলে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আবারও নতুন চুল্লি ওঠার আশঙ্কা থেকেই যাবে।