নিরাপদ সড়কের দাবি কি অধরাই থেকে যাবে

নতুন প্রজন্মই জাতির ভবিষ্যৎ। দেশ সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারিগর। কিন্তু সেই প্রজন্ম অল্প বয়সেই সড়কে অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও আইনের শাসনের অভাবে চরম বলি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতার বিষয়টি এতটাই স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে যে তা এখন আমাদের মানসিক জগতে কোনোভাবে প্রতিক্রিয়াই তৈরি করছে না। এরপরও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, গত এক বছরে সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ৮টি শিশু। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম লজ্জাজনক। এই রাষ্ট্র বা সরকার কোনোভাবেই সড়কে মৃত্যু ঠেকাতে পারছে না।  

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৪ শতাংশ শিকারই হলো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। মহাসড়ক বা শহরের চেয়েও গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কে শিশুদের মৃত্যুর হার বেশি। এর একটি বড় কারণ গ্রামীণ সড়কগুলো বসতবাড়িঘেঁষা। এসব এলাকায় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো নজরদারি থাকে না। ফলে গ্রামীণ জনপদে অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বেপরোয়া যান চলাচল শিশুদের জীবনকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে দুপুরে, যখন স্কুল ছুটি হয় বা শিশুরা বাড়ির পাশে খেলাধুলা করে, তখনই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে।

যে সড়কে যে পরিবহন চলার কথা না, সেখানে হরদম তা চলছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও অনুমোদন ছাড়া যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ছেন। তরুণেরা তারুণ্যের উত্তেজনায় মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন বেপরোয়া গতিতে। এর ফলে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষ মারা যাচ্ছে। শিশুরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। আহত ব্যক্তিদের সারা জীবন দুর্ভোগের জীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। কিন্তু অভিযুক্ত চালকেরা নানাভাবে ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ, অনুমোদিত ও মেয়াদোত্তীর্ণ পরিবহনের মালিকেরাও রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন। এভাবে কি সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব?  

পরিবহনবিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, আমাদের সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা কোনোভাবেই শিশুবান্ধব নয়। উন্নত বিশ্বে শিশুদের ‘নাজুক সড়ক ব্যবহারকারী’ হিসেবে বিবেচনা করে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়। স্কুল জোনে গতিসীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, শিশুদের রাস্তা পারাপারে নিয়োজিত থাকে বিশেষ তত্ত্বাবধায়ক। অথচ আমাদের দেশে অপরিকল্পিতভাবে মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নেই কোনো স্কুলবাসের ব্যবস্থা কিংবা নিরাপদ ফুটপাত। এমনকি প্রাথমিক পাঠ্যবইয়ে সড়ক–সচেতনতার যেটুকু শিক্ষা দেওয়া হয়, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না।

সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এখন বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে তিন চাকার অবৈধ যান, অটোরিকশা ও নছিমন-ভটভটির দাপট। শিশুদের পথচারী হিসেবে মৃত্যুর পেছনে এসব ছোট ও অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের দায় সবচেয়ে বেশি। চালকদের লাইসেন্স নেই, গাড়ির ফিটনেস নেই অথচ তাঁরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন অলিগলি থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত। এই নৈরাজ্য বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের নির্লিপ্ততা আজ ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, পরিবারের সুখ ও স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহ চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়। সন্তান হারানোর এই ট্রমা কোনো বদলি বা সান্ত্বনা দিয়ে মোচন করা সম্ভব নয়। সড়ককে নিরাপদ করতে হলে কেবল আইন করলেই হবে না, তার কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। স্কুল ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গতি নিয়ন্ত্রক স্থাপন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ব্যবহারিক ট্রাফিক শিক্ষা প্রদান এবং ঘাতক চালকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আমরা আর কোনো মায়ের সামনে তাঁর সন্তানের নিথর দেহ দেখতে চাই না। রাষ্ট্র ও সমাজকে মনে রাখতে হবে, সড়ক নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের উন্নয়নের সব দাবিই ফিকে হয়ে থাকবে।