পদ্মা সেতুর সুফল পেতে বাধা দূর করুন

সম্পাদকীয়

মেগা প্রকল্পের সুফল যখন প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর কথা, তখন সামান্য পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে একটি আঞ্চলিক সংযোগ সেতু কীভাবে পুরো সুফল আটকে দিতে পারে, তার বড় উদাহরণ শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদীর ওপর নির্মাণাধীন দুটি সেতু। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা-শরীয়তপুর রুটে যান চলাচল বহুগুণ বেড়েছে, মানুষের যাতায়াতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। অথচ কীর্তিনাশা নদীর ওপর দুটি জরাজীর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতুর কারণে প্রতিদিন অন্তত ২০ হাজার যাত্রীকে পোহাতে হচ্ছে মারাত্মক দুর্ভোগ।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, শরীয়তপুরের প্রেমতলা ও জাজিরার কাজীরহাট এলাকায় ১৯৯১ সালে নির্মিত মাত্র ৩ মিটার চওড়া দুটি সেতু আজ চরম জরাজীর্ণ। সেতুর বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে, মেঝের রড বেরিয়ে গেছে। সরু হওয়ার কারণে এক পাশের যানবাহন উঠলে অপর পাশের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। জাজিরা থেকে ঢাকায় দ্রুত পৌঁছে গেলেও এই স্বল্প দূরত্বের সেতু পার হতে গিয়েই যাত্রীদের বাড়তি আধা ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে।

সবচেয়ে ক্ষোভ ও বিস্ময়ের বিষয় হলো, ২০২০ সালে অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় এ দুটি নতুন সেতু নির্মাণের জন্য সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। অথচ পাঁচ বছর পার হতে চললেও কাজ শেষ হয়নি, এমনকি দুই বছর ধরে নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে! অথচ প্রেমতলা সেতুর প্রায় ৮০ শতাংশ এবং কাজীরহাট সেতুর ৬০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

৫৮ কোটি টাকা চুক্তিমূল্যের এই প্রকল্পের বিপরীতে যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা বিল তুলে নিয়েছে। তিনবার সময় বাড়ানোর পরও এখন ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে অতিরিক্ত প্রায় ৭ কোটি টাকা দাবি করা হচ্ছে এবং চতুর্থবারের মতো সময় বৃদ্ধির আবেদন জানানো হয়েছে। আমাদের দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে শুরুতে ধীরগতি, জমি অধিগ্রহণে সমন্বয়হীনতা এবং পরবর্তী সময়ে বাজেট ও সময় বাড়ানোর এই সংস্কৃতি নতুন নয়। কিন্তু যেখানে মূল কাজের সিংহভাগ শেষ, সেখানে আমলাতান্ত্রিক অনুমোদন বা অর্থ বরাদ্দের জটিলতায় দুই বছর কাজ বন্ধ রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বর্তমানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবটি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে অপেক্ষমাণ। আমরা মনে করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্য দূর করে দ্রুত এই প্রস্তাবের সুরাহা করা। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করা এবং বছরের পর বছর প্রজেক্ট ঝুলিয়ে রেখে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার পেছনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার।