জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা, মব সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ না হওয়ায় প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, সেটি নিরসনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে দেশে বিশেষ অভিযান চললেও শীর্ষ সন্ত্রাসী, পেশাদার ও চিহ্নিত অপরাধী গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই কম। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের সাফল্যও উল্লেখ করার মতো নয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়ে যায়। নিরাপত্তা নিয়ে নাগরিকদের মধে৵ উদ্বেগ তৈরি হয়। সবার প্রত্যাশা ছিল, তফসিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নতিতে সরকার, নির্বাচন কমিশন কার্যকর উদ্যোগ নেবে; কিন্তু তফসিল ঘোষণার এক দিন পরই ঢাকা–৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি সন্ত্রাসীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হন। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। ঢাকায় প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীতে সন্ত্রাসী হামলা হয়। ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে একজন পোশাকশ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করে তাঁর লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এসব সন্ত্রাসী হামলা ও মব সহিংসতা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক ছড়ায়।
গত কয়েক দিনে স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন নেতাসহ ঢাকা, যশোর, শরীয়তপুর ও নরসিংদীতে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ ছড়িয়েছে। এ ছাড়া দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও শরীয়তপুরে বোমা ও ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে অন্তত ২০ জন প্রার্থী ইসির কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছেন। একজন প্রার্থীকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা যায়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নতিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ইসি ও অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হলে তাতে পরিস্থিতি যেকোনো সময় আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। নিরাপত্তা নিয়ে এমন ভয় ও উদ্বেগ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশের জন্য মোটেও অনুকূল নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোকে এটা মনে রাখা জরুরি যে নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব কোনো অংশে কম নয়। আসক ও এমএসএফের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন থেকে এটা স্পস্ট যে তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক সহিংসতার সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আসকের তথ্য জানাচ্ছে, গত বছর অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। এই সংঘর্ষ যেমন দুটি দলের মধ্যে ঘটছে, আবার একই দলের দুই গ্রুপের মধ্যেও ঘটেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা যায়, নির্বাচনকালে সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়; কিন্তু এবার পরিস্থিতি আরও বেশি নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া পুলিশি ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা কার্যক্রম এখনো আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি, জেল থেকে পালিয়ে যাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থীদের মধ্যে অনেককে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি, খোয়া যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের অনেকে অনলাইনে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোও নির্বাচন নিয়ে নানা নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর এক মাসের মতো বাকি। দেশের স্থিতিশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—এসব বিষয় বিবেচনায় ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিকল্প পথ নেই। নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তার শঙ্কা দূর করতে হবে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, ভয়হীন নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।