কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা 

সম্পাদকীয়

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রহিম প্রায় ১৬ বছর আগে চাকরি ছেড়ে ১০০ টাকা দিয়ে ১০০টি কেঁচো কিনে ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি এখন প্রতিবছর ২৪০ মেট্রিক টন জৈব সার ও কেঁচো উৎপাদন করে ১৪ লাখ টাকার বেচাকেনা করেন; বছরে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা তাঁর লাভ থাকে। তাঁর এই উদ্যোগ এবং যাত্রা আমাদের আশাবাদী করে। 

বেকারত্ব সংকটের বিপরীতে উদ্যোক্তা এবং কৃষি খাতে সৃজনশীল উদ্ভাবনা—এই দুই জায়গা থেকে আবদুর রহিমের গল্প বাংলাদেশের তরুণসমাজের জন্য প্রেরণাদায়ক। বাংলাদেশে শিক্ষিত সমাজের মধ্যে বেকারত্বের তীব্রতার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষির মাধ্যমে উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান তৈরির প্রয়োজনীয়তা আমরা জানি। বিশেষত, বাংলাদেশের মতো কৃষিভিত্তিক সমাজে এই খাতে সৃজনশীল উদ্যোগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা সব সময়ই আশাব্যঞ্জক। 

উল্লেখ্য, মাটিতে জৈব সারের পরিমাণ ৫ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও সেখানে এখন আছে ১ শতাংশের নিচে। ফলে রাসায়নিক সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার যেখানে মাটির উর্বরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে, সেখানে আবদুর রহিমের জৈব সার তৈরির উদ্যোগ আরেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে বলে আমরা মনে করি। 

আবদুর রহিম ইতিমধ্যে তাঁর উদ্যোগের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার দিকে যাচ্ছেন। তিনি জানিয়েছেন, আগে সনাতন পদ্ধতিতে তৈরি সার কৃষকদের কাছে বিক্রি করলেও সম্প্রতি তিনি ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করছেন। এতে উৎপাদনের সঙ্গে তাঁর আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাঁর উৎপাদিত সার স্থানীয় কৃষক ছাড়াও যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলার কৃষক ও সার ব্যবসায়ীদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। 

আবদুর রহিমের উদ্যোগ কীভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করছে, এরও প্রমাণ পাওয়া যায় এই প্রতিবেদনে। তাঁর এই প্রকল্পে এখন পাঁচজন কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন। পাশাপাশি তাঁর এই উদ্যোগ দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কেঁচো সার তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। তাঁদের এই প্রচেষ্টা কৃষি খাতের সৃজনশীল উদ্ভাবনের সম্ভাবনাও আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। 

দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সরকারের পদক্ষেপ ও সহায়তাও প্রয়োজন। নাগরিকদের এমন বিচিত্র সৃজনশীল উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যতটা সম্ভব হ্রাস করা উচিত বলে মনে করি। জৈব সারের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের যেমন পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তেমনি উদ্যোক্তাদের লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার। প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদেরকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে এ ধরনের উদ্যোগ দেশের প্রতিটি গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।