বেপরোয়া অ্যাম্বুলেন্স চক্রকে থামান

গত বুধবার শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় রোগী নেওয়ার পথে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এমন মৃত্যু দুঃখজনক হলেও আমাদের দেশের বাস্তবতায় নতুন নয়। কিন্তু এই মৃত্যুর আগের ঘটনাপ্রবাহ সাধারণ অবহেলার চেয়েও ভয়াবহ। 

মারা যাওয়া রোগী জমশেদ আলী ঢালী ছিলেন একজন বয়স্ক মানুষ। তিনি গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর যা ঘটে, তা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে এসেছে, স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চক্রের বাধার মুখে পড়ে রোগীবাহী গাড়িটি। বাইরে থেকে ভাড়া নেওয়ার কারণে রাস্তায় দুই দফা অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা হয়। দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়। সেই সময় আর কখনো ফিরে আসে না। চিকিৎসার আশায় যাত্রা শুরু করা একজন মানুষ গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারান। 

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় রোগী নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়ার অভিযোগ আগেও উঠেছে। একই ধরনের ঘটনায় এর আগে ওই এলাকায় এক নবজাতকেরও মৃত্যু হয়েছে। প্রশ্ন হলো, কেন একটি চক্র দিনের পর দিন মানুষের জীবন নিয়ে এমন নিষ্ঠুর খেলা চালিয়ে যেতে পারছে। স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ীরা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বাইরের কোনো রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখেন, তবে তা সরাসরি অপরাধ। কে রোগী নেবে, কোন গাড়ি চলবে, ভাড়া কত হবে—এসব বিষয় জোর করে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার কারও নেই। অ্যাম্বুলেন্স সেবা জরুরি স্বাস্থ্যসেবার অংশ। এখানে দখলদারি মানে মানুষের জীবনকে পণ্যে
পরিণত করা।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভিযোগের পরও আইনগত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকা। পরিবার মৌখিকভাবে অভিযোগ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শোকাহত মানুষের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত অভিযোগ প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। এই অবস্থায় পুলিশ ও প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল উদ্যোগী হওয়া। 

আগের ঘটনাগুলোর পর যদি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে আজ হয়তো আরেকটি জীবন এভাবে ঝরে যেত না। আইন প্রয়োগের অনুপস্থিতিই এমন অপরাধকে বারবার উৎসাহিত করছে। 

এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি জরুরি। হাসপাতাল চত্বর ও আশপাশে কোনো অ্যাম্বুলেন্স কীভাবে চলবে, তার স্পষ্ট নিয়ম থাকতে হবে। ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জরুরি রোগী পরিবহনে কোনো ধরনের বাধা যেন না আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে। 

স্বাস্থ্যসেবা কেবল হাসপাতালের দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। রোগী পরিবহন তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে অব্যবস্থাপনা থাকলে চিকিৎসার সব আয়োজন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এমন মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।