ওয়াসার কাজ মানে মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো

সম্পাদকীয়

সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করেই যেকোনো সংস্থার উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের ঝুঁকি ও সমস্যা মাথায় রেখে প্রাক্কলন করা হয় ব্যয়। দৈব–দুর্বিপাক না হলে প্রাক্কলিত ব্যয় ও মেয়াদেই কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু ঢাকা ওয়াসার ৮০ শতাংশ প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও বেড়ে যায় বহুলাংশে।

প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, রাজধানীতে ভূ-উপরিভাগের পানি সরবরাহ বাড়াতে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পটি (ফেজ-৩) নেওয়া হয় সাত বছর আগে। এর মেয়াদ ছিল ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা।

এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের পানির উৎস মেঘনা নদীর দূষণ নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার টানাপোড়েনসহ নানা কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি।

এ প্রেক্ষাপটে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নতুন ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। সংশোধিত মেয়াদেরও আড়াই বছরের কম সময় বাকি। যদিও গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এ প্রকল্পে ঢাকা ওয়াসা নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার হাড়িয়া এলাকার মেঘনা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করার কথা।

উন্নয়ন বিক্ষিপ্ত কোনো বিষয় কিংবা সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান নয়। আমরা যদি ঢাকা শহরের চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগের পানিদূষণ কমাতে পারতাম, তাহলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে পদ্মা বা মেঘনা নদী থেকে পানি নিয়ে আসার প্রয়োজন হতো না। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দৈনিক প্রায় ৯৫ কোটি লিটার অপরিশোধিত পানি সায়েদাবাদের শোধনাগারে এবং অতিরিক্ত দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি লিটার পানি ঢাকা মহানগরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

কিন্তু প্রকল্পের অর্থায়নকারী দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা ২০১৭ সালে সায়েদাবাদ তৃতীয় পর্যায়ের পানি সংগ্রহের উৎসস্থল পরিদর্শন করে দূষণ দেখতে পান। এরপর মেঘনার দখল-দূষণ রোধ করতে ঢাকা ওয়াসা একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করে এবং মেঘনা নদী নিয়ে দাতাগোষ্ঠীর সমস্যা কেটে গেছে বলে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ঢাকা ওয়াসা ২০০৯ সাল থেকে মাটির নিচের পানির ব্যবহার কমিয়ে নদীর পানি শোধনের মাধ্যমে চাহিদা মেটানোর কথা বলে আসছে। সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান ২০২৩ সালের মধ্যে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎপাদন অন্তত ৭০ শতাংশে উন্নীত করার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার ধারেকাছেও তাঁরা যেতে পারেননি। সায়েদাবাদ-১ ও সায়েদাবাদ-২ প্রকল্প থেকে যে পানি পাওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে এসেছে অনেক কম। এ অবস্থায় ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে বেশি পানি উত্তোলন করতে হচ্ছে এবং ভূগর্ভে পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাচ্ছে।

নগর–গবেষণা ও নীতিবিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির অতি ব্যবহারের পরিণতি ভয়ানক হতে পারে। বাস্তবতাবিবর্জিত, উচ্চাভিলাষী সব প্রকল্প নেওয়াতেই এ অবস্থা, যার দায় টানতে হচ্ছে ওয়াসার গ্রাহকদের।

একদিকে ঢাকা ওয়াসা প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে, অন্যদিকে নগরবাসী সুপেয় পানি পাচ্ছেন না। এর অর্থ প্রকল্প নেওয়ার আগে যে তারা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজটি ঠিকমতো করেনি। সরকারপ্রধানের কয়েক গুণ বেশি মাইনে নেওয়া ঢাকা ওয়াসার এমডি এভাবেই নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ রেখে চলেছেন বটে।