যশোরের কেশবপুর উপজেলার চারটি গ্রাম—বাগডাঙ্গা, মনোহরনগর, আড়ুয়া ও কালীচরণপুর—দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে যে জলাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে, তা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাধারণ বর্ণনায় ধরা যায় না। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, বছরের প্রায় পাঁচ মাস গ্রামগুলোর দুই শতাধিক বাড়ি পানিবন্দী থাকে। এই পানিবন্দী থাকার প্রভাব পড়ে পুরো জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর। ফলে স্পষ্টতই সেখানে কাঠামোগত প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
সরেজমিন চিত্র বলছে, মানুষ ঘরে ঢুকতে নৌকা বা বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া, অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়া, বয়স্কদের দৈনন্দিন চলাফেরা—সবই অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা স্থানীয় লোকজনের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুতর চাপ তৈরি করছে। জলাবদ্ধ বাসিন্দাদের প্রায় সবার মুখে এক কথা, ‘এভাবে আর বসবাস করা যায় না।’ প্রশ্ন হচ্ছে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন?
এ সংকট নতুন নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা স্বীকার করছেন যে পানিনিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই; নদী দিয়ে স্বাভাবিক নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাড়ির ভেতর পানি ঢুকে পাঁচ-ছয় মাস থাকে। ক্ষতির পরিমাণও তুচ্ছ নয়—শুধু জমির ক্ষতিই প্রায় কোটি টাকার বলে দাবি করা হচ্ছে। তবু সমস্যা বছরের পর বছর চলমান। এখানেই প্রশ্ন ওঠে—যে সমস্যার প্রকৃতি, বিস্তার ও স্থায়িত্ব এত স্পষ্ট, তার সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা কেন অনুপস্থিত?
এলাকাবাসী দাবি করছেন নদী খনন এবং বিলভূমি উঁচু করার প্রকল্প। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় এটি পরীক্ষিত পদ্ধতি। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১৪০ কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্প চলমান এবং শেষ হলে জলাবদ্ধতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। আশার কথা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু দীর্ঘদিনের ভোগান্তির প্রেক্ষাপটে কেবল আশ্বাস যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের সময়সীমা, কাজের অগ্রগতি, স্থানীয়দের সঙ্গে সংযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য ও নিয়মিত জনসাধারণকে জানানো প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। জলাবদ্ধতা কেবল প্রকৌশলগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিকও। তাই অস্থায়ী ত্রাণ নয়, বরং স্থায়ী নিষ্কাশনব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বিকল্প আবাসন বা জীবিকা সহায়তা এবং বর্ষা মৌসুমের আগেই ঝুঁকি কমানোর প্রস্তুতি জরুরি। আমরা আশা করি, কেশবপুরের চার গ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় দীর্ঘসূত্রতা কাম্য নয়।