ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও সরকারি সেবামুখী প্রতিষ্ঠানগুলোয় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ অর্থ আদায়ের সংস্কৃতি যে এতটুকু বদলায়নি, রাজশাহীর বাঘা সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা তার এক দৃষ্টান্ত। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে ‘দলিল লেখক সমিতি’র নামে যে রমরমা চাঁদাবাজি চলেছে, তা সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও এখন নতুন মোড়কে ‘কল্যাণ তহবিল’ নামে ফিরে এসেছে। এ নিয়ে সংবাদ সংগ্রহে গেলে সাংবাদিককেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।
বাঘায় কল্যাণ তহবিলের নামে প্রতিটি দলিলে ৫০০ টাকা করে যে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে, তা কেবল অনৈতিকই নয়; এটি স্পষ্টতই সাধারণ মানুষের ওপর একধরনের জুলুম। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই চাঁদা তোলা নিয়ে হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে এমন অন্যায্য সংস্কৃতির অবসান প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দলীয় পরিচয় বদলে এখন নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ে একই ধরনের অপচর্চার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
প্রতিটি দলিলে এ টাকা নেওয়ার অজুহাত হিসেবে দেখানো হচ্ছে কোনো দুস্থ বা প্রয়াত সহকর্মীর পরিবারকে সাহায্য করা। নিজেদের সহকর্মীদের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু তার জন্য জোরপূর্বক সাধারণ জমি ক্রেতা কিংবা সাধারণ দলিল লেখকদের কাছ থেকে চাঁদা তোলা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো অভিযুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঔদ্ধত্য। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ‘আগের আমলে তো কিছু করতে পারেননি’ বলে সাফাই দেওয়া কিংবা সংবাদ প্রকাশের পরিণতি নিয়ে হুমকি প্রদান করা কেবল রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে না, বরং এটি আইনের শাসনকে সরাসরি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল। অপরাধের দায়ভার কখনোই অন্য কোনো অতীত অপরাধ দিয়ে ঢাকা যায় না।
স্থানীয় সাবরেজিস্ট্রারের বক্তব্য হচ্ছে, বিষয়টি তাঁর নজরে আসেনি। এটি অবশ্যই দায় এড়ানোর চেষ্টা। সরকারি কোনো কার্যালয়ের সীমানায় বা প্রাঙ্গণে অবৈধভাবে রসিদবিহীন অর্থ লেনদেন হলে তার দায় প্রথমত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়। কোনো লিখিত অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের অবিলম্বে স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, বাঘা সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে কল্যাণ তহবিলের আড়ালে চলতে থাকা এই চাঁদাবাজি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং সাধারণ জনগণকে অতিরিক্ত অর্থের জিম্মিদশা থেকে মুক্তি দিতে হবে।
দেশজুড়ে সাবরেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি আইনমন্ত্রীর বক্তব্যেও তা প্রকাশ পেয়েছে। আমরা আশা করব, সাবরেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম, হয়রানি ও জনদুর্ভোগ বন্ধে সরকার সদা আন্তরিক থাকবে।