পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা গতকাল মঙ্গলবার টানা চতুর্থ দিনেও অব্যাহত ছিল। সোমবার পর্যন্ত চার শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ কারণে বহু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং দেশের প্রধান রপ্তানি খাতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক। সেই দাবির দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তিও জরুরি। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতি এড়াতে হবে, যা শিল্পের স্থিতিশীলতা, শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলে। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এখন সব পক্ষের দায়িত্ব ধৈর্য ধরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের মজুরি দীর্ঘদিন ধরে নিচের সারিতে রয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা কার্যকর হয়। এরপর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। খাবার, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে শ্রমিকেরা যে হিমশিম খাচ্ছেন, তা উপেক্ষার সুযোগ নেই। সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের প্রত্যাশা বাড়াও স্বাভাবিক।
কিন্তু ন্যায্য দাবির আন্দোলনেও ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। পুলিশের গাড়ি, পুলিশ বক্স, কারখানা ও গুদামে হামলার ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সংযম দেখাতে হবে।
বিজিএমইএর হিসাবে, রোববার ৫২৯টি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে বের হয়ে গেছেন। অনেক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে। এই সাময়িক বন্ধ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদনসূচি ভেঙে পড়বে, সময়মতো পণ্য সরবরাহ কঠিন হবে। বিদেশি ক্রেতার আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। হারানো ক্রেতা ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত মালিক, শ্রমিক এবং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যবসাগুলোর ওপরও পড়বে।
পোশাকশিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা পুরো অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। শিল্পকে সচল রাখার প্রয়োজনীয়তা তাই সবাইকে বিবেচনায় নিতে হবে। আবার শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান উপেক্ষা করেও টেকসই শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ন্যায্য মজুরি এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের মধ্যে সমন্বয় করাই এখন প্রধান কাজ।
এই পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন ইতিবাচক পদক্ষেপ। শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। সুযোগটি কাজে লাগাতে বোর্ডকে অবিলম্বে কাজ শুরু করতে হবে। আলোচনার সময়সূচি, অগ্রগতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া শ্রমিকদের জানানো দরকার। তাঁদের ধৈর্য ধরতে বলার পাশাপাশি দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। দীর্ঘসূত্রতা কিংবা অস্পষ্ট আশ্বাস নতুন করে অবিশ্বাস তৈরি করবে।
শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে কাজে ফিরে মজুরি বোর্ডকে আলোচনার সুযোগ দিতে হবে। সরকার ও মালিকপক্ষকে সেই আস্থার মর্যাদা রাখতে হবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকেও ন্যায্যমূল্য আদায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করে উৎপাদন ও রপ্তানি সচল রাখার দায়িত্ব সব পক্ষের। পোশাকশিল্পকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতেই এখন সহযোগিতা, সংযম ও বিশ্বাসযোগ্য সংলাপ সবচেয়ে জরুরি।