বন বিভাগ যেন বন বিপন্নের কারণ না হয়

ঘুম থেকে জোর করে উঠিয়ে যদি আপনাকে ঘুমের ওষুধ খেতে দেওয়া হয়, ব্যাপারটা কেমন লাগবে? সম্প্রতি এমনই এক এলাহি কাণ্ড ঘটেছে সুন্দরবনে। প্রথম আলোর খবরে এসেছে যে সুন্দরবন নিয়ে স্থানীয়দের সচেতন করতে বনের মাঝেই সচেতনতামূলক সভা করেছে বন বিভাগ। 

সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলে নীরবতাই সবচেয়ে বড় সচেতনতা। সেই নীরবতার মধ্যেই বাঘ হেঁটে বেড়ায়, হরিণ দল বেঁধে চলে, বন্য শূকর খাবার খোঁজে। অথচ সেই বনেই প্যান্ডেল তৈরি করে, জেনারেটর চালিয়ে, শতাধিক মানুষ জড়ো করে সভা করেছে বন বিভাগ। উদ্দেশ্য বলা হচ্ছে বাঘ সংরক্ষণ ও বন রক্ষায় সচেতনতা। কিন্তু আয়োজনের ধরন দেখে প্রশ্ন ওঠে, সচেতনতা বাড়ানো হলো, নাকি বনকে আরও অস্বস্তিতে ফেলা হলো। 

সচেতনতামূলক সভা অবশ্যই প্রয়োজন। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে ও বাওয়ালিদের সঙ্গে কথা বলা দরকার। তাঁদের সঙ্গে বন রক্ষা ও বাঘ–মানুষ দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো জায়গা নির্বাচন। লোকালয়ে আয়োজনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বনের গভীরে সভা করতে হবে?

বনের ভেতরে মানুষের ভিড় মানেই শব্দ, আলো, চলাচল। জেনারেটরের কম্পন, মাইকের আওয়াজ, ট্রলারের যাতায়াত—এসবই বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনে বাধা সৃষ্টি করে। যে পরিবেশে বাঘের পায়ের শব্দই বড় ঘটনা, সেখানে মানুষের কোলাহল কখনোই তুচ্ছ নয়। 

এই আয়োজনের আরেকটি দিক আরও অস্বস্তিকর। বন রক্ষার নামে বনকে এক দিনের পিকনিক স্পটে পরিণত করা হয়েছে। বিরিয়ানি, গেঞ্জি, ক্যাপ এসব দিয়ে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়েছে। এতে কী বার্তা গেল। সুন্দরবন কি এমন জায়গা, যেখানে চড়ুইভাতি করে ফিরে আসা যায়! 

বন বিভাগের ব্যাখ্যায়ও স্বস্তি আসে না। কখনো বলা হচ্ছে লোকালয়ে অনুষ্ঠান করলে সমস্যা হতো। কখনো বলা হচ্ছে মাঝামাঝি জায়গা হওয়ায় সিদ্ধান্ত বদলানো হয়েছে। আবার প্রকল্প পরিচালকই স্বীকার করছেন, বনের ভেতরে এমন আয়োজন ঠিক হয়নি। এই দ্বন্দ্বই দেখায় পরিকল্পনার ঘাটতি। সংবেদনশীল একটি বন নিয়ে কাজ করতে গেলে পরিকল্পনায় আরও সতর্কতা দরকার। 

সুন্দরবন কোনো প্রদর্শনীক্ষেত্র নয়। এটি মানুষের বিনোদনের জায়গাও নয়। এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র, যেখানে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আলো প্রভাব ফেলে। সচেতনতা কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত এই বোধ তৈরি করা যে বনকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে তাকে শান্ত থাকতে দিতে হবে। 

বাঘ সংরক্ষণের কথা বলতে গিয়ে যদি বাঘের আবাসেই অস্বস্তি তৈরি করা হয়, তবে সেই সচেতনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। সুন্দরবনকে বাঁচানোর জন্য বড় আয়োজন নয়, দরকার বড় দায়িত্ববোধ। বনকে রক্ষা করার প্রথম শর্ত হলো বনকে তার মতো থাকতে দেওয়া।