চরবাসী কেন স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত হবে

দেশের উপকূল ও চরাঞ্চলের দুর্গম অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়েছে। এসব অ্যাম্বুলেন্স কার্যকরভাবে ব্যবহার না করায় এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো নৌ অ্যাম্বুলেন্স বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। এমন একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স পড়ে আছে পাবনার বেড়া উপজেলার যমুনার চরাঞ্চলে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, ২০১৩ সালের সরবরাহ করা সেই অ্যাম্বুলেন্স এক দিনের জন্যও রোগীর সেবায় ব্যবহৃত হয়নি। বিষয়টি কোনোভাবেই মানা যায় না।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, নদীবেষ্টিত ২৫টি চরের মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে সঠিক তদারকির অভাবে। হাসপাতাল চত্বরে আগাছা ও অবহেলায় পড়ে থাকা এই নৌ অ্যাম্বুলেন্স এখন এক কঙ্কালসার যানে পরিণত হয়েছে। ইঞ্জিনসহ এর মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে, আর বাকিটা নষ্ট হয়েছে দীর্ঘ সময় অযত্নে থেকে।

নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি চালু না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। চরম অমানবিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় তাঁদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাতে। অনেকে সে সুযোগও পান না। এটি শুধু দুর্গম এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা–বঞ্চনার গল্প নয়, তৃণমূলে প্রশাসনিক স্থবিরতা ও সরকারি সম্পদের চরম অপচয় ও অদূরদর্শিতারও বড় উদাহরণ।

জনবল নেই বা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেই—এসব অজুহাত তুলে একটি জীবনদায়ী যানকে নদীতে ডুবিয়ে রাখা বা পরিত্যক্ত করে রাখা কি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না? ২০১৭ সালে তৎকালীন কর্মকর্তা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও গত সাত বছরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ে কতজন অন্তঃসত্ত্বা নারী বা গুরুতর অসুস্থ রোগী দ্রুত চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারিয়েছেন, তার হিসাব কি কারও কাছে আছে? বর্ষা মৌসুমে যখন চরের গ্রামগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন একটি সচল নৌ অ্যাম্বুলেন্স হতে পারত হাজারো মানুষের আশার আলো। কিন্তু প্রশাসনের নিস্পৃহতায় সেই আশার তরি এখন ডাঙায় পড়ে ধ্বংস হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বর্তমান আশ্বাসগুলো ইতিবাচক মনে হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—এক যুগ ধরেও কেন সরকারি সম্পদটি নষ্ট হলো? এর পেছনে অতীতের সব উপজেলা কর্মকর্তার দায় নেই? নাগরিকের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ব পালনে তাঁদের এমন ভূমিকা খুবই হতাশাজনক। আমরা আশা করব, দেশের সব কটি নৌ অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনোযোগী হবে এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য সেগুলো নিয়মিত সচল রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।