বেসরকারি খাতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে স্বল্প সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা তহবিলের ঘোষণা দিয়েছে, তা প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী বলে আমরা মনে করি। তবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এই কর্মসূচি কতটা সফল হতে পারবে, তা নির্ভর করবে একটি সঠিক নীতিমালা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত থেকে ঋণ বিতরণের ব্যবস্থাপনার ওপর।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও লুটপাট, করোনা মহামারি, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অনিশ্চয়তা— এসব কারণে দু–একটি খাত বাদে বাংলাদেশের অর্থনীতির সব সূচকই বর্তমানে নিম্নগামী। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশের অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অন্য উদ্যোক্তারাও পকেটের টাকা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হননি। এ অবস্থায় বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ২৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। বিপরীতে উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি বেসরকারি খাতের এই স্থবিরতা সামগ্রিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সেটা নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে। এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কর্মসংস্থানে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, প্রণোদনা তহবিলের অর্থের ৪১ হাজার কোটি টাকা জোগান দেবে বাণিজ্যিক ব্যাংক, বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বেসরকারি খাত গড়ে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে। সরকার ভর্তুকি দেবে ৬ শতাংশ হারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এই প্রণোদনা তহবিলের মধ্য দিয়ে ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। অর্থনীতিবিদেরাও মনে করেন, স্বল্প সুদে পুনঃ অর্থায়নের উদ্যোগ শিল্প খাত পুনরুজ্জীবনে সহায়তা করতে পারে। তবে তার জন্য চাই স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, কার্যকর তদারকি ও যথাযথ খাত নির্বাচন।
প্রণোদনা তহবিলে সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে বন্ধ কারখানা খোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। এ ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ঋণ দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটা সবচেয়ে জরুরি। আমরা মনে করি, প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা উচিত। এ ছাড়া যেসব শিল্পকারখানা ধুঁকছে, সেগুলোর জন্যও স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া প্রয়োজন। সিএমএসএমই খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। সৃজনশীল অর্থনীতি খাতেও অনুদান রাখা হয়েছে। এ খাত কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের বড় একটি উৎস হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ খাতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন ও অনেক বেশি সতর্কতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই কোভিড মহামারির প্রভাব মোকাবিলায় দেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের যে নয়ছয় হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সরকারঘনিষ্ঠ কিছু প্রতিষ্ঠানই বিশাল সেই প্রণোদনা প্যাকেজের অনিয়মের সুবিধাভোগী ছিল। ফলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সেই কর্মসূচির সুফল জনসাধারণ পাননি। আমরা মনে করি, বর্তমান প্রণোদনা তহবিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতপক্ষেই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আছে কি না, সেটা সঠিক ও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা থাকাটাও জরুরি।