মন্ত্রী ও সাংবিধানিক সংস্থার প্রধান ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় আবাসনব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নৈতিকতার মানদণ্ড ও স্বার্থের সংঘাত বিবেচনায় এমন প্রকল্প কোনো যুক্তিতেই যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের একেবারে শেষ সময়ে এমন অপ্রয়োজনীয়, রাজসিক ও জনস্বার্থবিরোধী প্রকল্পের উদ্যোগ জনমনে বড় প্রশ্ন ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ঢাকার মন্ত্রিপাড়ায় নতুন তিনটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব ভবনে থাকবে ৭২টি ফ্ল্যাট, যার আয়তন হবে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। ‘ঢাকার রমনায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পে অপেক্ষাকৃত বড় ফ্ল্যাটগুলো মন্ত্রীদের জন্য এবং ছোট ফ্ল্যাটগুলো প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে। এসব ভবনে সুইমিংপুল রাখারও প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বর্তমানে মন্ত্রিপাড়ায় বাংলো, বেইলি রোডে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট; গুলশান, ধানমন্ডিসহ মন্ত্রীদের বসবাসের জন্য আবাসন রয়েছে। সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানদের জন্যও আলাদা বাসস্থান রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিজেদের বরাদ্দ করা বাসস্থান রেখে মন্ত্রিপাড়ায় থাকছেন কয়েকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি। আরও অনেক আবেদন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা রয়েছে। আইনি বাধা না থাকলেও মন্ত্রীদের সঙ্গে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ব্যক্তিরা একই স্থানে থাকাটা নৈতিকতার মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, এখানে স্বার্থের সংঘাত তৈরির শঙ্কা রয়ে যায়।
বাংলাদেশে মন্ত্রী ও আমলারা আবাসনসহ যেসব সুযোগ–সুবিধা ভোগ করেন, তা নিয়ে বহু বছর ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। মন্ত্রী ও আমলাদের যে বাংলো রাখাটা ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, নাগরিকদের সঙ্গে শাসকদের দৃশ্যমান পার্থক্য সৃষ্টি করার জন্যই এই চর্চা হয়ে আসছে। অথচ কোনো সরকারের আমলেই এমন চর্চা থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বর্তমানে মন্ত্রীদের থাকার জন্য যে ফ্ল্যাটগুলো রাখা হয়েছে, সেগুলোর আয়তন প্রায় ৫ হাজার বর্গফুট। নতুন প্রস্তাবে ফ্ল্যাটের আয়তন হবে আরও ৩ থেকে ৪ হাজার বর্গফুট বেশি। যেখানে ঢাকার উচ্চমধ্যবিত্তরা ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে বাস করেন; সেখানে মন্ত্রী ও আমলাদের জন্য এত বড় ফ্ল্যাট বানানো অনৈতিক ও বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। আমরা মনে করি, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক যথার্থই বলেছেন, যে দেশে চার কোটি মানুষ দরিদ্র, সে দেশে মন্ত্রীদের জন্য এত বিশালাকৃতির ফ্ল্যাট নির্মাণ অত্যন্ত বেমানান।
যে আমলারা এমন অপ্রয়োজনীয় ও রাজসিক ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রকল্প দিয়েছেন, তাঁরা দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে কতটা সম্যক ধারণা রাখেন, তা নিয়েই বড় প্রশ্ন তৈরি হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে, দারিদ্র্য বেড়েছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা বিরাজ করছে, জ্বালানি তেল ও গ্যাস–সংকটে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সরকারকে দেশি–বিদেশি বিশাল অঙ্কের ঋণ শোধ করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো বড় চাপে।
দেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানই এই মুহূর্তে সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ফলে এমন প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক, কাদের স্বার্থে আমলারা মন্ত্রীদের জন্য রাজসিক ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। আমরা মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই এমন অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী প্রকল্প থেকে সরে আসতে হবে।