গণতন্ত্রের উত্তরণযাত্রা মসৃণ হোক

সম্পাদকীয়

আজ ১৬ ডিসেম্বর, আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। এদিন চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের অবসান ঘটেছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। ২৫ মার্চ কালরাত্রি থেকে শুরু করে পরবর্তী ৯ মাস পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা আমাদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চাপিয়ে দিয়েছিল এবং বেছে বেছে যেভাবে শ্রেষ্ঠ মনীষাদের হত্যা করেছিল, আধুনিক ইতিহাসে তার নজির খুব বেশি নেই।  ৯ মাসে তারা হত্যা করেছিল এ দেশের ৩০ লাখ মানুষকে। নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন দুই লাখ নারী।

আজ মহান বিজয় দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করছি ছাত্র, সৈনিক, কৃষক, শ্রমিক, নারী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের আত্মদানের সেই ইতিহাসকে। স্মরণ করছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ স্বাধীনতাসংগ্রাম পরিচালনাকারী প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বদানকারী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, জেনারেল ওসমানী, মাওলানা ভাসানীসহ সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের।  

আমাদের স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা; যেখানে ধর্ম-বর্ণ-জাতিনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবেন এবং নিজের মতপ্রকাশ ও চর্চা করতে পারবেন। আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ও গণতন্ত্রের অপরিহার্য কাঠামো বিচার বিভাগ, জাতীয় সংসদ স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে, সংবাদমাধ্যম সব ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে নিঃশঙ্ক চিত্তে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

গত ৫৪ বছরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটলেও স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে আমরা অনেকটাই দূরে সরে গেছি। সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক অসমতা প্রবলভাবে বেড়েছে।  সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা গণতন্ত্রের ভিত শক্তিশালী করতে পারিনি। বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় সামরিক শাসন ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অধীন থেকেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক নেতৃত্ব কী ধরনের দুঃশাসন চাপিয়ে দিতে পারে, তার কাছের উদাহরণ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। আমাদের গোত্রতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সব ক্ষমতা একজন নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকাটাই গণতন্ত্র পথচ্যুত হওয়ার মূল কারণ।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসানের পর দেশের মানুষ নতুন করে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যেতে বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি, পুলিশ, দুদকসহ কিছু সংস্কারের ক্ষেত্রে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। ১৬ মাসেও মব সহিংসতা বন্ধ করা যায়নি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতিও হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও সহিংসতা উসকে দেয়, এমন বক্তব্য বন্ধ করা যায়নি। নারী এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের পরিসরও সংকুচিত হয়েছে। নাগরিকের অধিকার রক্ষায় শক্তভাবে দাঁড়াতে না পারার ব্যর্থতা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় বলে আমরা মনে করি। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোও নাগরিকের অধিকার প্রশ্নে জোরালো অবস্থান নিতে পারেনি।

এবারের বিজয় দিবসের বিশেষ তাৎপর্য হলো, নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণযাত্রায় এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করি, যে গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রত্যাশা থেকে মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।

এবারের বিজয় দিবসের আনন্দ ও গৌরব প্রত্যেক মানুষকে স্পর্শ করুক। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণযাত্রা মসৃণ হোক। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চেতনায় সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে উঠুক। দেশবাসীকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।