একটি দেশে নাগরিকদের চলাচলের জন্য ন্যূনতম অবকাঠামো নিশ্চিত করা স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব। অথচ নাটোর সদর উপজেলার লালমনিপুর গ্রামে বহু বছর ধরে একটি কাঁচা রাস্তা সংস্কার না হওয়া এবং নারদ নদের ওপর কেবল একটি জরাজীর্ণ বাঁশের সেতু টিকে থাকা—সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিদারুণ ব্যর্থতাই বলতে হবে। ভোটের সময় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া মিথ্যা আশ্বাস আর লালফিতার দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত যখন গ্রামের অর্ধশত তরুণ নিজেদের পকেটের চাঁদা ও স্বেচ্ছাশ্রমে ইট-বালু দিয়ে রাস্তা সংস্কারের কাজে নামতে বাধ্য হন, তখন জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি, প্রশাসনের কাঠামোগত সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
বড় হরিশপুর ইউনিয়নের লালমনিপুর গ্রামের এই তরুণদের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয়, অনুপ্রেরণাদায়ী ও নাগরিক সক্রিয়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গ্রামের মানুষের কাছ থেকে তাঁরা চাঁদা সংগ্রহ করেছেন। সেই সঙ্গে প্রতিটি বাড়ি থেকে ডালি ও কোদাল নিয়ে সবাই মিলে রাস্তা সংস্কারের কাজে নেমে পড়েন। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, কোনো সমাজ যদি দাসানুদাস মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের শপথ নেয়, তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে উপেক্ষা করে তারা অনেক দূর যেতে পারে। কিন্তু এই উদ্যোগের মুদ্রার অপর পিঠটি অত্যন্ত করুণ ও হতাশাজনক। যে দেশে জনগণের দেওয়া রাজস্বের টাকায় বিশাল উন্নয়ন বাজেট তৈরি হয়, সেখানে একটি গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা ও একটি ছোট পাকা সেতুর জন্য কেন সাধারণ মানুষকে কোদাল-ডালি হাতে রাজপথে নামতে হবে? নাগরিকের নিজস্ব আর্থিক অংশগ্রহণে রাস্তা সংস্কার হওয়া কোনো রাষ্ট্রের জন্য গর্বের বিষয় হতে পারে না; বরং এটি অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত ধস ও স্থানীয় প্রশাসনের চরম লজ্জা।
রাস্তাটির মাঝখানে নারদ নদের ওপর আছে একটি বাঁশের সেতু। বৃষ্টি হলে কাদায় রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তখন গ্রামের বাসিন্দাদের হেঁটে জেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়। সড়কটি সংস্কারে তরুণদের এই উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদপত্রে আসার ফলে দেরিতে হলেও সেখানকার দুর্ভোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এখন আশ্বাস দিচ্ছেন, সড়কটি পাকাকরণে ‘অগ্রাধিকার দেওয়া হবে’।
আমরা বিশ্বাস করি, লালপুরের উদ্গ্রীব তরুণসমাজ কেবল একটি কাঁচা রাস্তা সংস্কার করেনি, বরং তারা স্থানীয় সরকারের চোখ ফোটানোর মতো এক নীরব সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে। আমরা আশা করব, নাটোর সদর উপজেলা প্রশাসনকে অবিলম্বে লালমনিপুর গ্রামের রাস্তাটির স্থায়ী পাকাকরণ এবং নারদ নদের ওপর পাকা সেতু নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।