মাতৃস্বাস্থ্য কি কেবলই মুনাফার পণ্য

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ান সেকশনের হার যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাকে কেবল ‘উদ্বেগজনক’ বললে ভুল হবে; এটি এখন একটি জাতীয় স্বাস্থ্যসংকটে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছর দেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী যেখানে মাত্র ২১ শতাংশ শিশুর জন্ম অস্ত্রোপচারে হওয়ার কথা, সেখানে বাংলাদেশে এই হার বর্তমানে ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। আরও ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে, যেখানে প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে ৯টিরই জন্ম হচ্ছে অস্ত্রোপচারে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে চিকিৎসাসেবা এখন সেবার চেয়ে বাণিজ্যিক মুনাফাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

অস্ত্রোপচারের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে এক গভীর যোগসূত্র—চিকিৎসকদের সময়ের অভাব, ক্লিনিকের মালিকদের আর্থিক লোভ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া অমূলক ভয়। স্বাভাবিক প্রসব একটি দীর্ঘমেয়াদি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যার জন্য ধৈর্য ও সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের অনেক চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই সময়টুকু দিতে নারাজ। এর বদলে অস্ত্রোপচারকে একটি ‘সহজ ও দ্রুত’ সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এমনকি স্বাভাবিক প্রসবকে যন্ত্রণাদায়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিত্রায়িত করে গর্ভবতী মা ও তাঁদের পরিবারের মনে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার মায়ের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ায় এবং নবজাতকের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের পেছনে ব্যয় হচ্ছে, যা সরাসরি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বেসরকারি মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল বা মানসম্মত প্রসবকক্ষ না থাকা সত্ত্বেও তারা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনে লিপ্ত। সরকারি নীতিনির্ধারকেরাই স্বীকার করছেন, এই খাতে সরকারি নজরদারির যে ভয়াবহ ঘাটতি রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এখানে কেবল সচেতনতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ওপর সরকারি তদারকি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মিডওয়াইফারি বা দক্ষ ধাত্রীসেবাকে উৎসাহিত করা এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিক প্রসবের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা আরও উন্নত করা প্রয়োজন।

প্রকৃতিপ্রদত্ত স্বাভাবিক প্রসবের প্রক্রিয়াকে যদি বাণিজ্যিক কারণে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়, তবে ২০৩০ সাল নাগাদ হাসপাতালে সন্তান প্রসবের ৯০ শতাংশই হবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে—বিশেষজ্ঞদের এই আশঙ্কা সত্যে পরিণত হতে দেরি নেই। মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যকে এই ব্যবসায়িক চক্র থেকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।