ভয়ের পরিবেশ অগ্রগতির পথে বড় বাধা

সম্পাদকীয়

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের যে অগ্রযাত্রা, তার পেছনে শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে নারীর অবদান নিশ্চিত করেই বড় ভূমিকা রেখেছে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সম্মুখসারির মুখ ছিলেন নারীরা। কিন্তু গত ১৬ মাসে বাস্তব ও ডিজিটাল—দুই ক্ষেত্রেই নারীর পরিসর সংকুচিত হয়েছে। মব সহিংসতা ও অনলাইন আক্রমণের মুখে নারীরা ব্যাপকভাবে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছেন। এমন পরিবেশ একদিকে যেমন নারীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে, অন্যদিকে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে বাস্তবে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপে সরকার এমন অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা সহিংসতাকারীদের উৎসাহিত করেছে। অকার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই পরিস্থিতি আরও নাজুক করে তুলেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা যে কতটা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, সাম্প্রতিক জরিপ ও মানবাধিকার প্রতিবেদনগুলো তার সুস্পষ্ট প্রমাণ হাজির করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের পুরো বছরের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে ১৮ শতাংশ বেশি মামলা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন থেকেও নারী ও শিশু নির্যাতনের উদ্বেগজনক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা ও ৭৪৯টি ধর্ষণের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অর্ধেকের বয়সই ছিল ১৮ বছরের নিচে, অর্থাৎ শিশু। বছরজুড়ে ১ হাজার ২৩টি শিশু নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

গত বছরের নভেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের ৬৬ শতাংশের বেশি গণপরিবহনে, ডিজিটাল জগতে ও পারিবারিক বৃত্তে ঘটা সহিংসতাকে গুরুতর সমস্যা বলে মনে করেন।

নারীর প্রতি সহিংসতার বড় একটি ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। রাজনীতিতে সক্রিয় নারী, সংস্কৃতিকর্মী, নারী খেলোয়াড়, উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থী—কেউই অনলাইন সহিংসতা থেকে রেহাই পাননি। সংঘবদ্ধভাবে বিদ্বেষমূলক ও যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যের সঙ্গে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রতিকার ও সামাজিক প্রতিরোধ না থাকায় নারীর নিরাপত্তাহীনতা বহুগুণ বেড়েছে।

বাস্তব ও ডিজিটাল পরিসরের সহিংসতার পাশাপাশি মব সন্ত্রাস ও নীতি পুলিশিংয়ের ঘটনায় জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তাহীনতার বোধ আরও বেড়েছে। আসকের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে অন্তত তিনজন নারীর নিহত হওয়ার তথ্য জানা যাচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার লালমাটিয়ায় মব সহিংসতার শিকার হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। নারীকে প্রকাশ্যে লাঠিপেটা করার ঘটনাও ঘটেছে। বাসসহ গণপরিবহনেও যৌন নিপীড়ন, কটূক্তি ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বেড়েছে।

নারী যদি ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকেন, তাহলে অর্থনীতিসহ সামাজিক সূচকগুলোতে বাংলাদেশের যে দৃশ্যমান অগ্রগতি, তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের ইশতেহারে নারীর নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সরকার এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে নারীর সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।