কক্সবাজারের পরিবেশ বিপর্যয় রুখবে কে

সম্পাদকীয়

কক্সবাজারের রামু ও চকরিয়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বিস্তীর্ণ জনপদে তামাক চাষের যে আগ্রাসন শুরু হয়েছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়; বরং এক ভয়াবহ পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয়ের অশনিসংকেত। একসময়ের সবজি ও ধানের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত গ্রামগুলো এখন তামাকের বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। বনাঞ্চল উজাড় করে তামাক পোড়ানোয় ঘটছে জনস্বাস্থ্যের চরম অবনতি। এতে চরম ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কক্সবাজার ও বান্দরবানে প্রায় ১৩ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে এবং পাতা পোড়ানোর জন্য বসানো হয়েছে ৫ হাজার ৬০০টি চুল্লি। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি একর তামাক পোড়াতে গড়ে ১৩০ মণ কাঠের প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে প্রতি মৌসুমে প্রায় ১৭ লাখ মণ বনের কাঠ পুড়ছে এই চুল্লিগুলোতে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই লোকালয়ে, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশেও বসানো হয়েছে এই বিষাক্ত চুল্লি। সংরক্ষিত বন ও সামাজিক বনায়নের কাঠ দিয়ে যেভাবে শতভাগ তামাক পোড়ানো হচ্ছে, তা আমাদের বনজ সম্পদকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। অথচ প্রশাসন ও বন বিভাগের এই বিষয়ে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। শুধু তা–ই নয়, তাদের ‘ম্যানেজ’ হয়ে থাকার অভিযোগের বিষয়টিও গুরুতর।

তামাক কোম্পানিগুলো কৌশলী বিনিয়োগের মাধ্যমে চারা, কীটনাশক ও নগদ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে প্রান্তিক চাষিদের প্রথাগত খাদ্যশস্য চাষ থেকে সরিয়ে আনছে। কৃষক সাময়িক লাভের মুখ দেখলেও দীর্ঘ মেয়াদে তার জমির উর্বরতা হারাচ্ছে। এ ছাড়া চুল্লিতে কাজ করা নারী ও শিশুদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এমনকি তামাক পোড়ানোর মৌসুমে বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে গ্রামের বাতাস নিশ্বাস নেওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসার ও হাঁপানির মতো মরণব্যাধি ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর শাখা ও খালগুলোর পানি আজ দূষিত। কৃষি বিভাগ চাষিদের নিরুৎসাহিত করার কথা বললেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর দায় এড়ানোর যে সংস্কৃতি লালন করছে, তা অগ্রহণযোগ্য। পরিবেশবিদদের দাবি, বনের কাঠ পুড়িয়ে তামাক পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ চুল্লিগুলো অবিলম্বে ধ্বংস করতে হবে। যেসব কৃষক লাভের আশায় তামাক চাষ করছেন, তাঁদের উচ্চ মূল্যের সবজি বা অর্থকরী ফসল চাষে সরকারিভাবে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। তামাক কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারি নীতিনির্ধারকদের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।

প্রশাসন, বন বিভাগ, কৃষি অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর—সব কর্তৃপক্ষকে সম্মিলিতভাবে এই তামাকের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। নয়তো এ জনপদের পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয়ের দায় তাদেরই নিতে হবে।