নোংরা পরিবেশেই কেন চিকিৎসাসেবা

সম্পাদকীয়

অসুস্থ মানুষের শেষ আশ্রয় হাসপাতাল। সেখানে একজন রোগী চিকিৎসা নিতে গিয়ে যদি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, মানবিক বিপর্যয়ও বটে। হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর সংকটের নির্মম প্রতিচ্ছবি। শিশুদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে স্যাঁতসেঁতে মেঝে, অপরিচ্ছন্ন টয়লেট, ভাঙা বেড, অবাধে হকার প্রবেশ এবং ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধির অনুপস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই অব্যবস্থার শিকার হচ্ছে শিশুরা—যারা সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল এবং সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে।  হাসপাতালের পরিবেশ যদি এমন হয় যে রোগীর স্বজনেরা নিজেরাই ঝাড়ু দেন, নিজেদের টাকায় স্যালাইন কিনে আনেন কিংবা টয়লেট ব্যবহারের পর বমি করতে থাকেন, তাহলে সেই হাসপাতালের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

অবশ্যই সমস্যার একটি অংশ মানুষের অসচেতনতার সঙ্গেও যুক্ত। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক যেমন বলেছেন, অনেকে টয়লেটে ডায়াপার ফেলেন, ময়লা ডাস্টবিনে না ফেলে যত্রতত্র ফেলেন। কিন্তু এই বাস্তবতা দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না। কারণ, একটি সরকারি হাসপাতালের দায়িত্ব শুধু চিকিৎসা দেওয়া নয়, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও। সেখানে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিয়মিত তদারকি, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ থাকা আবশ্যক। অথচ দেখা যাচ্ছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওয়ার্ডে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দেখা নেই। কিন্তু হকাররা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এটি শুধু শৃঙ্খলার অভাব নয়, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতা।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো সমস্যাগুলো নতুন নয়। দেশের বহু সরকারি হাসপাতালেই একই চিত্র দেখা যায়। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানো হলেও সেবার মানোন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না। অবকাঠামো সংস্কার, জনবল নিয়োগ ও জবাবদিহির অভাবে হাসপাতালগুলো ক্রমেই রোগীর জন্য ভোগান্তির জায়গায় পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডের মতো সংবেদনশীল স্থানে এমন পরিবেশ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, টয়লেট ও পানি সরবরাহব্যবস্থার দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। তৃতীয়ত, হাসপাতালের ভেতরে হকার প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে রোগীর স্বজনদের সচেতন করাও জরুরি, যাতে তাঁরা নিজেরাও পরিবেশ নোংরা না করেন।

স্বাস্থ্যসেবা কোনো দয়া নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। একটি শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি সংক্রমণ, দুর্গন্ধ ও অবহেলার মধ্যে দিন কাটায়, তবে তা সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে না। হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিত্রকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কসংকেত, যা এখনই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।