কারাবন্দীদের আইনগত অধিকার ও মৌলিক মানবাধিকার সুনিশ্চিত করা যেকোনো সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর ২০০ শয্যার হাসপাতালটির বর্তমান চিত্র এ মৌলিক দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রের চরম উদাসীনতা ও প্রশাসনিক স্থবিরতাকে স্পষ্ট করে তোলে। দীর্ঘ দুই দশক আগে নির্মিত একটি হাসপাতাল ভবন ও প্রায় পৌনে নয় কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও জনবলের অভাবে সেটি পড়ে আছে অকেজো হয়ে। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কাশিমপুরের চার–পাঁচটি কারাগারে প্রায় ১২ হাজার বন্দী অবস্থান করছেন, যাঁদের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত সংকটাপন্ন রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। জরুরি চিকিৎসাসেবার অভাবে কিংবা শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথেই অনেকের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। অথচ কারাচত্বরেই নির্মিত ২০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালটিতে স্থায়ী কোনো চিকিৎসক, কনসালট্যান্ট, নার্স বা টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সাময়িক প্রেষণে আসা চিকিৎসক দিয়ে বহির্বিভাগ চালানো হলেও অন্তর্বিভাগ সম্পূর্ণ বন্ধ। তার চেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ২০১১ ও ২০১৩ সাল থেকে কোটি টাকার এক্স-রে, আলট্রাসাউন্ডসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দী পড়ে থেকে এখন নষ্ট হওয়ার মুখে। একদিকে মূল হাসপাতালেই সেবা নেই, অন্যদিকে রেফার করা তাজউদ্দীন মেডিকেল হাসপাতালেও বন্দীদের জন্য আলাদা কোনো ‘প্রিজন ওয়ার্ড’ নেই। ফলে সব দিক থেকেই কারাবন্দীরা এক চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
কারারক্ষীদের স্বল্প মেয়াদে নার্সিং প্রশিক্ষণ দিয়ে সংকট কাটানোর চেষ্টা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। চিকিৎসার জটিল ক্ষেত্রগুলোয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত কারিগরি জনবলের বিকল্প নেই। হাসপাতালটির জন্য পদ সৃষ্টি করা হলেও দুই দশকেও স্থায়ী নিয়োগ না হওয়া স্বাস্থ্য বিভাগ ও কারা কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা ও প্রশাসনিক অবহেলারই প্রমাণ। হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে কোনো মহলের বাধা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার অপচয় এবং একই সঙ্গে বন্দীদের চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এ চিত্র কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অবিলম্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও কারা কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে কাশিমপুর কারা হাসপাতালের সৃষ্ট পদগুলোয় স্থায়ী জনবল নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো দ্রুত পরীক্ষা করে সচল করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় বন্ধ করা এবং বন্দীদের জীবনের সুরক্ষায় এ হাসপাতাল অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ শক্তিতে চালু করার আর কোনো বিকল্প নেই।