তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ছাত্রী হাটহাজারী থানায় অজ্ঞাতনামা পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলাও করেছেন। কিন্তু এমন গুরুতর ঘটনার ৪ দিন পরও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ।

এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গত বুধবার প্রথম আলো সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গড়িমসি ও উদাসীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। আমরা আরও অবাক হয়েছি, যৌন নিপীড়কদের শনাক্ত না করে উল্টো ছাত্রীদের হলে ফেরার সময়সীমা বেঁধে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

রেজিস্ট্রার, প্রক্টর ও বিভিন্ন হলের প্রভোস্টদের নিয়ে উপাচার্য শিরীণ আখতারের এক বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় বিচারের দাবিতে বুধবার রাতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন ছাত্রীরা। চার কর্মদিবসের মধ্যে যৌন নিপীড়নের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করাসহ চারটি দাবি জানান তাঁরা। অন্যথায় প্রক্টরিয়াল বডিকে পদত্যাগ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও শিক্ষার্থীদের এ দাবি মেনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাধিক ছাত্রী যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। বেশির ভাগ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা শাস্তি পাননি। ক্যাম্পাসের ভেতরে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় অভিযোগ ওঠে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের বিরুদ্ধেও। কিন্তু এ নিয়ে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে এ সেল তৈরি করা হলেও সেটিকে পরিকল্পিতভাবে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে বলে শিক্ষক মহল থেকেই অভিযোগ এসেছে। ছাত্রীরা কোনো অভিযোগ নিয়ে গেলে সেটিকে গুরুত্ব দেন না সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। অভিযোগ আমলে নিলেও সেটি দিনের পর দিন ফেলে রাখা হয়। এমনকি চার বছর ধরে পড়ে আছে এমন অভিযোগও আছে। অথচ স্বয়ং উপাচার্যই এ সেলের আহ্বায়ক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সুবর্ণা মজুমদার প্রথম আলোকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ক্যাম্পাসের ভেতর ছাত্রীদের সঙ্গে ঘটা বেশির ভাগ ঘটনায় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরাই জড়িত। সেলে যাঁরা আছেন, তাঁরা ছাত্রসংগঠনটির নেতা-কর্মীদের চটিয়ে ক্ষমতাসীন দলের বিরাগভাজন হতে চান না। কারণ, এখানে পদ-পদবির সঙ্গে আর্থিক সুবিধা, অনুদান, ব্যক্তিগত পদোন্নতিসহ নানা কিছু জড়িত।’ এমন পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষায় দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠানটির ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত আমরা।

যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল ভেঙে নতুন কার্যকর সেল গঠন করার দাবিও জানিয়েছেন বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা। সেই সঙ্গে অভিযোগ পাওয়ার এক মাসের মধ্যে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। নয়তো সেলের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান গঠনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। চার কর্মদিবসের মধ্যে সেলের চলমান অভিযোগগুলোর দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

আমরা প্রত্যাশা করছি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সব ধরনের দাবি মেনে নেবে এবং যৌন নিপীড়নের ঘটনার বিচারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। যৌন নিপীড়কদের শনাক্ত করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। তাঁদের কোনোভাবেই ছাড় নয়।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন