পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাকেই আধুনিক করতে হবে

সম্পাদকীয়

বাসযোগ্যতার দিক থেকে তলানিতে থাকা বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা তৃতীয়। এর একটি বড় কারণ যানজট—এ নিয়ে কারোরই দ্বিমত থাকার কোনো কারণ নেই। ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, ঢাকায় যানজটের কারণে বছরে প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। শুধু কর্মঘণ্টা নষ্ট আর অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, যানজটের কারণে নগরবাসীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যেরও অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।

মেট্রোরেলের মতো আধুনিক ও গতিশীল গণপরিবহন যুক্ত হওয়ার পরও ঢাকার সড়কগুলোতে ধীর, মধ্য ও দ্রুতগতির প্রায় ১৮ সংস্করণের যানবাহন চলাচল করে। সড়কে একই সঙ্গে এতগুলো সংস্করণের যানবাহন চলাচল করার মানেই হচ্ছে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়া। এর সঙ্গে অকার্যকর ও সেকেলে ট্রাফিক ব্যবস্থা ঢাকার সড়কে যে নৈরাজ্য তৈরি করছে, তার ফলে কর্মব্যস্ত সময়ে ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে নেমে এসেছে।

পরিবহন–বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ট্রাফিক পুলিশের হাত ও লেজার লাইটনির্ভর যে সিগন্যাল ব্যবস্থা তার বদলে ট্রাফিক সিগন্যালকে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনায় আনা গেলে ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা অনেকখানি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। গত বছরের আগস্ট মাসে ঢাকার সাতটি সিগন্যালে পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করার পর এ বছরের মে মাস থেকে কয়েকটি সিগন্যালে পরীক্ষামূলকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ি শনাক্ত করছে ক্যামেরা এবং গাড়ির মালিকের নামে ডিজিটালি মামলা দেওয়া হচ্ছে।

স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ও এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অনেক সিগন্যালে চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা বেড়েছে। এটি বিশ্বজুড়ে পরীক্ষিত ও স্বীকৃত যে কোনো সেবা ও ব্যবস্থা ডিজিটাল রূপান্তর করা হলে দুর্নীতি কমে; একই সঙ্গে নাগরিকদের মধ্যে আইন মানার রেওয়াজ বাড়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার আরও ৫০টি স্থানে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক বাতি চালুর যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, সেটাই প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাকেই এই আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও পরিবেশদূষণকারী যানবাহন অপসারণের এবং যানবাহনের অতিরিক্ত হর্ন নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও নির্দেশনা দিয়েছেন। অতীতে আমরা দেখেছি, ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নানা সময়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। কারণ, তাৎক্ষণিক কিছু নড়াচড়া ছাড়া এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। আসলে সড়কে শৃঙ্খলা বা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পাক্ষিক বা মাসিক অভিযান বা সাময়িক উদ্যোগের বিষয় নয়, এ ক্ষেত্রে কঠোর নীতি অনুসরণ ও ধারাবাহিকতা বজায় না রাখলে পরিবর্তন নিশ্চিত করা যায় না।

আমরা মনে করি, সড়ক থেকে শুধু পুরোনো বাস অপসারণই যথেষ্ট নয়, ঢাকার গণপরিবহন–ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। বাসগুলোকে কোম্পানি বা ছাতার নিচে এনে গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে হবে।

ঢাকার যানজট ও সড়কের বিশৃঙ্খলার একটি বড় কারণ এখন নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা। ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক বাতি ও এআই প্রযুক্তি বসানোর পরও এসব নিয়ন্ত্রণহীন রিকশার কারণে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ঢাকার সড়ক থেকে এক ধাপে এসব রিকশা বন্ধ করাটা কঠিন। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্দিষ্ট করে সেখানে এসব রিকশার প্রবেশ ও চলাচলকে একেবারে শূন্যতে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এটি করতে হলে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। পর্যায়ক্রমে অন্য রাস্তাগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনতে হবে। আসল কথা হলো, বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ পরিকল্পনা করা গেলে পর্যায়ক্রমে ট্রাফিক ব্যবস্থায় অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।