মানসিক বিভাজন হটাতে উদ্যোগ নিন

সম্পাদকীয়

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের বসানো সচেতনতামূলক একটি সাইনবোর্ডকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের দুই গ্রাম আকবরনগর ও মিরারচরের বাসিন্দাদের সহাবস্থান ভেঙে আজ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পর্যবসিত হয়েছে।

সাইনবোর্ডের সবুজ পটভূমিতে সাদা অক্ষরে লেখা নাম—‘আকবরনগর বাজার’ এখন এমন এক প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা শুধু স্থান-নির্দেশনা নয়, বরং আধিপত্যের দাবির ভাষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, মিরারচরের মানুষ মনে করছে, সাইনবোর্ডে তাদের গ্রামের নামও থাকা উচিত ছিল। আর আকবরনগরের বাসিন্দাদের দাবি, বাজারটি তাঁদের এলাকাতেই পড়েছে। সুতরাং সাইনবোর্ডে যে নাম আছে, তা ঠিকই আছে। এই নিয়ে কয়েক বছর ধরে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চলছে। এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত খুনোখুনিতে গড়িয়েছে।

সাইনবোর্ডে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধে সর্বশেষ গত সোমবার আবারও সংঘর্ষ হয়েছে। এতে মিরারচর গ্রামের ২ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। সংঘর্ষে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি কয়েক ঘণ্টা বন্ধ ছিল ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, বিষয়টি আর সামান্য প্রশাসনিক ত্রুটি বা নাম বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামাজিক সম্পর্কের গভীর অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। এটি প্রতীকী ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

আকবরনগরের বাসিন্দাদের যুক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান, মৌজা-নিবন্ধন ও অবকাঠামোগত বাস্তবতার কারণে যেমন বাস্তবতার একটি দিক নির্দেশ করে, তেমনি মিরারচরের বাসিন্দারা যৌথ উদ্যোগ, ঐতিহাসিক নাম ও সমান অংশগ্রহণের যুক্তিতে যে দাবি করেছেন, তা–ও একটি সমান গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে। কিন্তু এই দ্বিমাত্রিক বাস্তবতা আলোচনার টেবিলে সমাধানের বদলে পরস্পরবিরোধী শ্রেষ্ঠত্ববোধে রূপ নিয়েছে। ‘আমার’ বনাম ‘তোমার’—এই সংকীর্ণ সীমানা রচনা করতে গিয়ে উভয় পক্ষই ‘আমাদের’ সম্ভাবনাকে বিসর্জন দিয়েছে।

এই শ্রেষ্ঠত্ববাদী মনস্তত্ত্বই বিরোধকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এসব লক্ষণ নির্দেশ করে—সংঘর্ষ কেবল বাহ্যিক নয়, বরং মানসিক ও সামাজিক বিভাজন গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। একটি সাইনবোর্ড এখানে কারণের চেয়ে অধিকতর অজুহাত। প্রকৃত সংকট নিহিত রয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বী পরিচয়বোধে।

তবে এই পরিস্থিতির দায় কেবল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপ করে দায়মুক্ত হওয়া যায় না। সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাইনবোর্ড স্থাপনের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধে কার্যকর হস্তক্ষেপের অভাব প্রশাসনিক উদাসীনতার প্রকট দৃষ্টান্ত। যখন দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম সংঘর্ষ সংঘটিত হয়, তখনই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান (যেমন যৌথ নাম পুনঃপ্রতিষ্ঠা বা বিকল্প নিরপেক্ষ নামকরণ) উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি প্রশমিত করা যেত।

এখন প্রতীকী আধিপত্যের প্রতিযোগিতা পরিহার করে বাস্তবসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়া জরুরি। এই সত্য সব পক্ষকেই অনুধাবন করতে হবে।