দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিন

সম্পাদকীয়

মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের কাছে এই জাতি চিরঋণী। তাঁদের সম্মানে মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ নানা প্রচেষ্টা আছে আমাদের রাষ্ট্রের। কিন্তু ঋণ সেই স্বীকারের ব্যবস্থাপনায় যখন বড় কোনো অনিয়ম চলে আসে, তাতে সবচেয়ে বেশি অসম্মান করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদেরই।

প্রথম আলোর খবরে এসেছে, বরগুনার আমতলীতে জালিয়াতি করে ভুয়া হিসাব খুলে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তোলা হয়েছে ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। যে মানুষগুলো দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁদের প্রাপ্য সম্মানী আত্মসাৎ করা মানে স্বাধীনতার মূল্যবোধকে অবমাননা করা।

দেখা যাচ্ছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯১ লাখ টাকা ভুয়া ও অননুমোদিত ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে। এর বড় অংশ ইতিমধ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে। আরও বিস্ময়কর হলো, পুরো প্রক্রিয়া যাচাই ও অনুমোদনের বাইরে সম্পন্ন হয়েছে। আমরা মনে করি, এ ধরনের জালিয়াতি এককভাবে সম্ভব নয়। এখানে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভূমিকা, তদারকির ঘাটতি এবং উচ্চপর্যায়ের কোনো যোগসাজশের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তদন্তে দেখা গেছে, একাধিক ভুয়া প্রোফাইল খুলে ভাতা উত্তোলন করা হয়েছে এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থ অন্যের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। এমনকি মৃত মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকেও প্রতারণার শিকার হতে হয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই লিখিতভাবে জালিয়াতির কথা স্বীকার করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছেন। এ অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা প্রশাসনের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। ফলে তদন্ত কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বিস্তৃত পরিসরে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ অনুসন্ধান নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে দুটি দিক জরুরি। প্রথমত, দায় নিরূপণ করে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা সরাসরি অর্থ আত্মসাৎ করেছে, যারা এ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করেছে এবং যারা দায়িত্বে থেকে গাফিলতি করেছে, তাদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে ভাতা বিতরণের প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল যাচাই, সরাসরি উপকারভোগীর হিসাবে অর্থ প্রেরণ এবং নিয়মিত নীরিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তাঁদের প্রতি জাতির ঋণ স্বীকারের একটা মাধ্যম। আমরা আশা করি, বরগুনায় মুক্তিযোদ্ধা ভাতা জালিয়াতির ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা হবে।