মুসা কবিরের এই উদ্যোগ শিক্ষণীয় 

সম্পাদকীয়

জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পের জাঁতাকলে আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়ে ওঠে পরিবেশ। অতিবৃষ্টি বা তীব্র তাপপ্রবাহের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে পড়ে আমাদের বোধোদয় হয়, বৃক্ষনিধন এতই বেশি হয়েছে যে সবুজের চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের দিকে তাকিয়ে তখন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বা পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সাড়ম্বরে চারা রোপণ ও বিতরণের ছবি তুলে ও প্রচার করেই যেন উদ্যোগের ইতি ঘটে যায়। এই দেখানেপনার বিপরীতে কুষ্টিয়ার চিকিৎসক এ এস এম মুসা কবিরের উদ্যোগ যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি আশাজাগানিয়া।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় তাঁর গড়ে তোলা ‘স্মাইল ফর অল’ সংগঠনের কার্যক্রম কেবল গাছ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; চারা রোপণ থেকে শুরু করে তা পূর্ণাঙ্গ গাছে পরিণত হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার টেকসই পরিচর্যা নিশ্চিত করছে। গাছের চারা দেওয়ার আগে প্রশিক্ষণ, সার-মাটির সঠিক নিয়ম শেখানো, গবাদিপশুর হাত থেকে রক্ষায় খুঁটি ও পলিথিন পেঁচিয়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং কোনো গাছ মারা গেলে সেখানে নতুন চারা রোপণের এই যে একনিষ্ঠতা—তা আমাদের সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগগুলোর জন্য এক অনন্য অনুকরণীয় মডেল বলে মনে করি।

গত তিন বছরে তাঁর উদ্যোগে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার চারা রোপণ ও বিতরণ করা হয়েছে। তরুণদের সঙ্গে নিয়ে যেমন পরিচর্যা করেন, একই সঙ্গে ‘প্ল্যান্ট হাব’ স্থাপন করে আবেদনপত্রের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী চারা বিতরণ করেন। তিনি কেবল বৃক্ষরোপণ ও তদারকিতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। স্থানীয় নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করারও উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। গত এক বছরে তাঁর উদ্যোগে ২০০ নারী সেলাই প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ পেয়েছে। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে কীভাবে লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নিয়ে এসে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া যায়, মুসা কবির ও তাঁর দল আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।

আমরা দেখেছি, বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ ভীষণ গুরুত্ব পেয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানা গেছে। বিভিন্ন সময় আমরা সরকারি অনেক উদ্যোগ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভেস্তে যেতেও দেখেছি। আমরা মনে করি, সরকার মুসা কবির ও তাঁর দলের মতো দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা এই ধরনের স্বপ্রণোদিত উদ্যোগগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে পারে। সমাজের বৃহৎ অংশগ্রহণ ছাড়া কেবল আমলাতন্ত্রের ওপর ভর করে এমন উদ্যোগ সহজে সফলতার মুখ দেখবে না।

আমরা চাই পরিবেশ সুরক্ষা, পুষ্টির চাহিদা মেটানো এবং টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে এ ধরনের দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক সারা বাংলাদেশে।