দুর্গম চর কিংবা পার্বত্য অঞ্চল—দেশের প্রান্তিক এলাকাগুলো বরাবরই নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্য বা শিক্ষার সুযোগ কম থাকায় এসব এলাকার মানুষ আরও বেশি পিছিয়ে থাকে। এরপরও এসব এলাকার মানুষ বেসরকারি নানা সহযোগিতা ও নিজ উদ্যোগে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার একটি দুর্গম গ্রামের মানুষেরা নিজেদের উদ্যোগে নিজেদের সুবিধাগুলো তৈরি করে নিয়েছেন। এটি সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, পাঁচ বছর আগেও যেখানে সুপেয় পানির জন্য শুকনাছড়িপাড়ার তঞ্চঙ্গ্যা নারীদের দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করতে হতো, আজ সেখানে প্রতিটি ঘরের আঙিনায় পানি পৌঁছে গেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর আট লাখ টাকার প্রকল্প তৈরি করেও যা বাস্তবায়ন করতে পারেনি, পাড়াবাসী নিজেদের প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত বনের বাঁশ ও কলাবাগান বিক্রির টাকায় তা অনায়াসেই সম্পন্ন করেছেন। দুই কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন থেকে শুরু করে এর রক্ষণাবেক্ষণ—সবই হয়েছে গ্রামবাসীর যৌথ পরিশ্রমে। এটি প্রমাণ করে, স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং জন–অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে যেকোনো বড় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
কেবল পানি নয়, শুকনাছড়িপাড়ার মানুষেরা নিজেদের উদ্যোগে চলাচলের সড়ক নির্মাণ করেছেন, গড়ে তুলেছেন শিশুদের জন্য বিদ্যালয় এবং ধর্মীয় উপাসনালয়। তাঁদের এই ‘স্বনির্ভর’ মডেলটি মূলত পাহাড়ের প্রাচীন ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন, যেখানে প্রতিটি পাড়া নিজের প্রয়োজনে নিজেই শক্তিশালী থাকত। বর্তমান যুগে যখন সামান্য ড্রেন বা রাস্তা নির্মাণের জন্য মানুষ মাসের পর মাস জনপ্রতিনিধিদের পেছনে ঘোরে, তখন শুকনাছড়িপাড়ার এই স্বকীয়তা আমাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতার মুখে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
তবে এই স্বনির্ভরতার গল্পের একটি ধূসর দিকও আছে। শুকনাছড়িপাড়ার মানুষের আত্মসম্মানবোধ ও ঐক্য যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি রাষ্ট্রের উদাসীনতা এখানে প্রকট। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং উপজেলা প্রকৌশলীরা যখন বলেন যে ‘আবেদন করলে সহযোগিতা করা হবে’, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় যে প্রান্তিক জনপদগুলো এখনো রাষ্ট্রের মূল উন্নয়নের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। একটি জনপদ যখন নিজেদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা সরকারি সেবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে নিজেরাই সব করতে বাধ্য হয়, তখন তা কেবল তাদের জয় নয়; বরং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ব্যর্থতাকেও ফুটিয়ে তোলে।
আমরা মনে করি, শুকনাছড়িপাড়ার এই মডেল সারা দেশের গ্রামীণ উন্নয়নে প্রয়োগ করা যেতে পারে। সরকার যদি কেবল ওপর থেকে নিচে প্রকল্প চাপিয়ে না দিয়ে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগকে উৎসাহ ও কারিগরি সহায়তা দেয়, তবে উন্নয়নের চিত্র আরও টেকসই হতে পারে। স্বনির্ভর গ্রাম গড়ার জন্য শুকনাছড়িপাড়া অনুসরণীয় হোক। আমরা এ গ্রামের মানুষদের অভিবাদন জানাই।