রংপুর বিভাগের মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবার যে করুণ চিত্র, সেটি আমাদের আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি। বিভাগটিতে নবজাতক ও শিশুমৃত্যুর হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি এবং প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুও উদ্বেগজনকভাবে বেশি। এসব পরিসংখ্যান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বছরের পর বছর একটি অঞ্চলের প্রতি রাষ্ট্রীয় ও সরকারি নীতিনির্ধারকদের অবহেলার প্রতিফলন।
গত বুধবার রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এ–সংক্রান্ত একটি গোলটেবিল বৈঠকে রংপুর বিভাগে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনায় ওই অঞ্চলের বিদ্যমান পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো উঠে আসে। রংপুরে মাতৃস্বাস্থ্যের সংকটের মূল কারণগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয় সেখানে। এ করুণ পরিস্থিতির প্রধানত কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বাল্যবিবাহের উচ্চ হারকে। জাতীয় পর্যায়ে যেখানে ১৮ বছরের নিচে কিশোরীদের বিয়ের হার ২৭ শতাংশ, সেখানে রংপুরে তা ৬৩ শতাংশ। এর সরাসরি ফলাফল হিসেবে ১৯ বছরের আগে গর্ভধারণের পরিমাণও এখানে অনেক বেশি, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। এই কিশোরী মায়েরা নিজেরাই শিশু, যাদের শরীর ও মন মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত নয়।
এ সমস্যার পেছনে আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মধ্যে কোনো কার্যকর সংযোগ নেই। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনবল ও অবকাঠামোর অপর্যাপ্ততা। সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত কর্মী ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনেক মানুষই প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা একাধিক সমাধানের কথা বলেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও বাল্যবিবাহ রোধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একা এ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। এর জন্য শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা অপরিহার্য। দুর্গম চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে পরিবহনসুবিধার ব্যবস্থা করা, বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স–সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, রংপুরকে বাদ দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো স্বাস্থ্যসেবার সাফল্য আসবে না। তাই রংপুরের জন্য আলাদাভাবে বরাদ্দ, জনবল ও বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; বরং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে সরকার জনবল দেবে এবং বেসরকারি খাত অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করবে।
আমরা আশা করব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ রংপুর অঞ্চলের এ সংকটকে গুরুত্ব দেবে এবং বিশেষজ্ঞদের সুপারিশগুলো বিশেষ বিবেচনায় নেবে।