বাংলাদেশের সংবাদপত্রশিল্প এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কাগজের দাম বেড়েছে, বিজ্ঞাপন কমেছে; অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এই পটভূমিতে সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) নেতারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কর ও শুল্ক কমানোর যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
প্রাক্-বাজেট আলোচনায় নোয়াব যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার মূল লক্ষ্য হলো করের বোঝা কমানো। নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে ৩ শতাংশ শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার, করপোরেট কর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানো, বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর উৎসে কর কমানো—এসব দাবি একত্রে বিচার করলে বোঝা যায়, সংবাদপত্রশিল্প বেশ চাপে রয়েছে।
নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী আলোচনায় বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দুষ্প্রাপ্যতা রয়েছে এবং আগামী দিনে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় পত্রিকা প্রকাশ অব্যাহত রাখা কঠিন।
করোনা মহামারির পর থেকেই সংবাদপত্রশিল্পে বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমেছে, সার্কুলেশনও কমেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান প্রচলিত প্রিন্ট মিডিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, পাঠকের অভ্যাসও বদলেছে। বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রশিল্প এখন ডিজিটাল রূপান্তরের চাপে। এ রকম অবস্থায় বিজ্ঞাপনদাতাদের অনেকেই অনলাইনে চলে গেছে।
নোয়াব বলছে, নিউজপ্রিন্টের ওপর শুল্ক ও ভ্যাটের কারণে কাগজের ল্যান্ডেড কস্ট ১৩০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় চাপ। এই খাতে করছাড় দেওয়া একটি যৌক্তিক দাবি। কারণ, সংবাদপত্র শুধু একটি পণ্য নয়, এটি গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তথ্যপ্রবাহ ও জনমত গঠনে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম।
করপোরেট কর ২৭ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সংবাদপত্রকে যদি বিশেষ খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে দাবির যৌক্তিকতা রয়েছে। করপোরেট কর কত হবে, তা নির্ধারণে একটি ভারসাম্য দরকার। বর্তমানে অন্যান্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্প ১০-১২ শতাংশ কর-সুবিধা পাচ্ছে। সংবাদপত্রশিল্পের ক্ষেত্রে সেই তুলনা কতটা প্রযোজ্য, তা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
নোয়াবের প্রস্তাবে বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের ওপর উৎসে কর এবং অগ্রিম কর নিয়ে যে সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে, তা খুবই বাস্তব। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের লাভই ১০ শতাংশের কম হয়, তাহলে ১০ শতাংশ কর আগাম দিয়ে রাখা যুক্তিযুক্ত নয়। এ ক্ষেত্রে করব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন, যাতে বাস্তব আয় অনুযায়ী কর সমন্বয় করা যায়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সংবাদপত্রশিল্প কি রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার দাবিদার? এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হবে, অনেক শিল্পই করোনা-পরবর্তী সময়ে প্রণোদনা পেয়েছে। কিন্তু সংবাদপত্রশিল্প পায়নি। এটি একটি বৈষম্য। তবে প্রণোদনা বা করছাড় দেওয়া হলে তার সঙ্গে কিছু শর্ত পালনের অঙ্গীকার থাকতে পারে, যেমন স্বচ্ছ আর্থিক হিসাব, কর্মীদের সুরক্ষা, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অন্যথা করছাড় কেবল মালিকদের সুবিধা বাড়াবে, কিন্তু শিল্পের কাঠামোগত উন্নয়ন ঘটাবে না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ইতিমধ্যে জানিয়েছে, করপোরেট কর বাড়ানো হবে না এবং অন্যান্য কর নিয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এটি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। এখন প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যেখানে রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায় এবং সংবাদপত্রশিল্পের টিকে থাকার প্রয়োজন—দুটি বিষয়ই বিবেচনায় থাকবে।
শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, সংবাদপত্রশিল্প কেবল একটি ব্যবসা নয়। এটি জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সংবাদপত্রের মতো গণমাধ্যম দুর্বল হলে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়। অতীতে বিভিন্ন সরকারের কাছে এসব বিষয়ে দেনদরবার করে কোনো ফল পাওয়া যায়নি। আশা করি, নতুন সরকার দাবিদাওয়াগুলো যৌক্তিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।