মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা যাবে না

সম্পাদকীয়

সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং অনলাইন পরিসরে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইনের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই আইনের ভাষা যদি অস্পষ্ট হয়, অপরাধের সংজ্ঞা যদি সুনির্দিষ্ট না থাকে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে সেই আইন মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্বেগকে তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশে ডিজিটাল পরিসরসংক্রান্ত আইন নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারা সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। মামলার ভয়, গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে একধরনের ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছিল। আইন পরিবর্তনের পরও সেই অভিজ্ঞতা ও আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। এখন নতুন সংশোধনীর মধ্য দিয়ে আগের বিতর্কিত বিধান কোনোভাবে ফিরে এলে তা হবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সরকার বলছে, গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে আইনটি করা হচ্ছে না এবং কোনো সাংবাদিক এর অপপ্রয়োগের শিকার হোন, সেটিও তারা চায় না। এ বক্তব্য ইতিবাচক হলেও শুধু সদিচ্ছার আশ্বাস যথেষ্ট নয়। একটি আইনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার ভাষা, সংজ্ঞা, প্রয়োগপদ্ধতি ও জবাবদিহির ব্যবস্থার ওপর। আইনের মধ্যে কার্যকর রক্ষাকবচ না থাকলে ভবিষ্যতে সেই আইন যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সমালোচক বা স্বাধীন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থের বিষয় নয়। স্বাধীন গণমাধ্যম নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করে, ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনে এবং দুর্নীতি, অনিয়ম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রকাশ করে। সাংবাদিকেরা যদি মামলা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ। তাই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা বা গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু এই ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। সংবাদ প্রকাশসংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ফৌজদারি আইনের পরিবর্তে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর গণমাধ্যম কমিশনকে প্রাথমিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে সুরক্ষা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক গণমাধ্যম ও পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন নাগরিকের মতপ্রকাশ, তথ্য বিনিময়, প্রতিবাদ এবং জনপরিসরে অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একজন সাধারণ নাগরিকের ফেসবুক পোস্ট, অনলাইন মন্তব্য কিংবা সরকারের সমালোচনাও সংবিধানস্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ। সাংবাদিকদের জন্য রক্ষাকবচ রেখে সাধারণ নাগরিকদের অস্পষ্ট অভিযোগে মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানির মুখে ঠেলে দেওয়া সমানভাবে অগ্রহণযোগ্য।

আমরা জানি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। অনলাইনে সহিংসতার উসকানি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, যৌন হয়রানি, প্রতারণা কিংবা পরিকল্পিতভাবে ক্ষতি করার মতো অপরাধ মোকাবিলায় আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু সমালোচনা, ব্যঙ্গ, ভিন্নমত, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। অপরাধের প্রতিটি সংজ্ঞা হতে হবে স্পষ্ট এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

গণমাধ্যম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি করার সিদ্ধান্ত আশাব্যঞ্জক। তবে এই পরামর্শপ্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না। খসড়াটি জনসমক্ষে প্রকাশ করে সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী, আইনজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ ও সাধারণ নাগরিকের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় সংসদেও এর প্রতিটি ধারা নিয়ে অর্থবহ আলোচনা হতে হবে। কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়—এমন আইন করা যাবে না।