এআই ভিডিও নিয়ে সতর্কতা জরুরি

সম্পাদকীয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা নিয়ে বিভ্রান্তি ও শঙ্কা ততই বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা মিথ্যা ভিডিও বা ডিপফেক এবং সস্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করে সংবাদপত্রের ফটোকার্ড নকল করে ভুয়া বক্তব্য প্রচার বা চিপফেকের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আমরা দেখছি, প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও অপতথ্য ছড়ানোর কৌশল হিসেবে ডিপফেক, চিপফেককে অস্ত্র করা হচ্ছে। বিভিন্ন দল ও প্রার্থীর পক্ষেও এআই দিয়ে নির্মিত লেবেলবিহীন ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেখানে ডিজিটাল সাক্ষরতার হার একেবারে তলানিতে, সেখানে অনলাইন প্রচারণার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর আরও বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণই সবচেয়ে বেশি জরুরি। বাস্তবে সেটা কতটা দেখা যাচ্ছে, তা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।

তথ্য যাচাইকারী সংস্থা ডিসমিস ল্যাবের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, নির্বাচন সামনে রেখে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নির্মিত ভিডিও ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে প্রচারণা চলছে। এসব ভিডিও সত্যি নাকি এআই দিয়ে তৈরি করা, সেটা জানানো হচ্ছে না। জানুয়ারি মাসের ১ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত ফেসবুকে এ রকম ৮০০টি ভিডিও শনাক্ত করেছে সংস্থাটি, এর ৬০ শতাংশের ক্ষেত্রেই কোনো লেবেল ব্যবহার করা হয়নি। ইউটিউবে পাওয়া ১৮১ ভিডিওর ৯৪ শতাংশের ক্ষেত্রেই সেগুলো যে এআই দিয়ে তৈরি করা, সেই তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। টিকটিকের ৫০টি ভিডিওর একটিতেও এআই লেবেল পাওয়া যায়নি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা অতি বাস্তবসম্মত ভিডিও যে ভোটারদের বিশ্বাসকে নাড়া দিতে পারে এবং মতামতকে প্রভাবিত করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, আর্জেন্টিনা, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো তার দৃষ্টান্ত। শুধু মাঠের সহিংসতা নয়, ডিজিটাল জগতের এই সহিংসতা আধুনিক দিনের গণতন্ত্রের অন্যতম বড় হুমকি। বাংলাদেশের বিভাজিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই হুমকি আরও বাস্তব। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষমূলক, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো আধেয় বা কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করা নিষিদ্ধ। নির্বাচনী আচরণবিধিতেও এআই ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো নিষিদ্ধ।

আমরা মনে করি, শুধু আইন সংশোধন করলেই ইসির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। উপরন্তু শনিবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) চালু করা অনলাইন-ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটিতে অন্তত ১৪ হাজার সাংবাদিকের ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়ে ইসি কতটা সতর্ক ও দায়িত্বশীল, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

তথ্যপ্রযুক্তিবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বাচনে ডিপফেকই একমাত্র হুমকি নয়, সাইবার আক্রমণের ব্যাপারেও সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের অনেকে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার করছেন। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই এসব বক্তব্য সামাজিক বিভাজনকে উসকে দিচ্ছে।

আমরা মনে করি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য নির্বাচনের পরিবেশের ওপর কোনোভাবেই যেন নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে, তার জন্য ইসিকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সজাগ হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রার্থীদেরও অনলাইন প্রচারণার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে, কঠোরভাবে আচরণবিধি মেনে চলতে হবে।