এই অবহেলার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে

জননিরাপত্তার প্রতি অবহেলা যেন আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, বুধবার চট্টগ্রামের রাউজানে পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে সাড়ে তিন বছরের শিশু মেজবাহর মৃত্যু হয়েছে। ব্যাপারটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়া যেত, কিন্তু সেই সুযোগ আমাদের হাতে নেই। কেননা, এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের আরেকটি দৃষ্টান্ত।

চার থেকে পাঁচ বছর আগে সরকারি প্রকল্পে গভীর নলকূপের জন্য গর্ত খোঁড়া হয়েছিল। নলকূপ বসানো হয়নি কিন্তু গর্তও ভরাট করা হয়নি। কোনো সতর্কচিহ্নও দেওয়া হয়নি। একটি বসতবাড়ির মাত্র কয়েক শ ফুট দূরে এমন একটি মরণফাঁদ বছরের পর বছর খোলা পড়ে ছিল। প্রশাসন দেখেও দেখেনি। এই দায়িত্বহীনতা ও অবহেলার সময়সীমা এত দীর্ঘ ছিল যে শেষ পর্যন্ত সেই গর্তই কেড়ে নিল একটি শিশুর প্রাণ। 

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সন্ধ্যার আগে থেকেই শিশুটিকে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তাঁরা গর্তের ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ পেয়েছিলেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা চার ঘণ্টার চেষ্টায় শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খেলতে খেলতে শিশু মেজবাহর এই করুণ মৃত্যুর সান্ত্বনা কী তার বাবা–মা ও স্বজনদের কাছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে শিশু মৃত্যুর এটিই প্রথম ঘটনা নয়। মাত্র দেড় মাস আগেই রাজশাহীর তানোরে একইভাবে পরিত্যক্ত নলকূপের গর্তে পড়ে দুই বছরের সাজিদের মৃত্যু হয়। সেখানে টানা ৩১ ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধার হয়েছিল শিশু সাজিদ, তবে মৃত অবস্থায়। রাউজানে আবারও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হলো। এর মানে স্পষ্ট, আগের ঘটনা থেকে প্রশাসন শিক্ষা নেয়নি। কোনো দায় স্থির হয়নি। 

উন্নয়নের নামে আমাদের প্রশাসন জায়গায়–বেজায়গায় গর্ত খোঁড়ে, কিন্তু বন্ধ করতে ভুলে যায়, পরিণতিতে তৈরি হয় মরণফাঁদ। সেই ফাঁদে যদি শিশু পড়ে মারা যায়, তবে দায় শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নকারীর নয়; দায় পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর।

এখন আর দুঃখ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। তদন্ত কমিটি গঠনে এখনই জানতে হবে, কোন প্রকল্পে এই গর্ত খোঁড়া হয়েছিল। কেন নলকূপ বসানো হয়নি। কেন গর্ত বন্ধ করা হয়নি। এই ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। মেজবাহর মৃত্যু আমাদের সামনে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা। এখনই যদি জবাবদিহি নিশ্চিত না করা হয়, তবে আগামী লাশটির জন্যও রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারবে না।