কুমিল্লায় দায়ী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন

সম্পাদকীয়

একটি শহর শুধু ইটের দেয়াল আর পিচঢালা পথ দিয়ে তৈরি হয় না; শহরের প্রাণভোমরা থাকে তার প্রকৃতি আর ইতিহাসের মধ্যে। কিন্তু কুমিল্লা নগরের টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়কে গত কয়েক দিনে যা ঘটেছে, তা শুধু উন্নয়ন নয়; বরং প্রকৃতির বুকে এক নিষ্ঠুর কুঠারাঘাত। সড়ক প্রশস্ত করার অজুহাতে রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হয়েছে শতবর্ষী সাতটি বিশালাকৃতির গাছ, যার মধ্যে ছিল ২০০ বছরের পুরোনো একটি বটগাছও।

এই বৃক্ষনিধনের ধরনেই লুকিয়ে আছে চরম অস্বচ্ছতা। রাতের অন্ধকারে কেন গাছ কাটতে হবে—প্রশ্নটিই বলে দেয় যে কাজটি জনস্বার্থে নয়, বরং জনচক্ষুর আড়ালে অসৎ কোনো উদ্দেশ্য সাধনে করা হয়েছে। যে বিশালাকৃতির রেইনট্রি আর বটগাছগুলো কয়েক প্রজন্ম ধরে পথচারীদের ছায়া দিয়েছে, পাখিদের আশ্রয় হয়েছে এবং শহরের ভারসাম্য রক্ষা করেছে, সেগুলোকে আজ অবলীলায় গুঁড়ি বানিয়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, এই ধ্বংসযজ্ঞের দায় নিয়ে সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে চলছে কাদা–ছোড়াছুড়ি। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর বলছে তারা জানে না, অন্যদিকে সিটি করপোরেশন বলছে গাছগুলো ২০২০ সালের পুরোনো নিলামের মাধ্যমে কাটা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, ২০২০ সালের নিলামের গাছ ২০২৬ সালে এসে কেন কাটা হচ্ছে? আর ২০০ বছরের পুরোনো বটগাছটি যখন নিলামের তালিকায় ছিলই না, তখন সেটি কোন সাহসে উপড়ে ফেলা হলো? বন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী এটি ‘বুনো গাছ’ হওয়ায় নিলামে ছিল না, কিন্তু সেই একই অজুহাতে কি একে ধ্বংস করার বৈধতা পাওয়া যায়?

উন্নয়নের প্রয়োজনে রাস্তা বড় হতে পারে, কিন্তু সেই উন্নয়নের নকশা কেন এমন হবে, যেখানে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস আর পরিবেশকে বিসর্জন দিতে হয়? আধুনিক নগর–পরিকল্পনায় এখন গাছ বাঁচিয়েই রাস্তা নির্মাণের অসংখ্য নজির রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে সস্তায় বড় রাস্তার দোহাই দিয়ে কয়েক লাখ টাকার কাঠের লোভে কোটি টাকার বেশি অক্সিজেন দেওয়া সম্পদকে তুচ্ছ করা হয়।

আমরা দাবি জানাই বৃক্ষনিধনের এই ‘রহস্যজনক’ ঘটনার সঠিক তদন্ত হোক। রাতের আঁধারে গাছ কাটার নেপথ্যে কার লাভ রয়েছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। একই সঙ্গে কাটা পড়া প্রতিটি শতবর্ষী গাছের বদলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অন্তত ১০ গুণ বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, পিচঢালা রাস্তা মানুষের যাতায়াত সহজ করে ঠিকই, কিন্তু শীতল ছায়া আর বিশুদ্ধ বাতাসের অভাবে শহর যখন উত্তপ্ত চুল্লিতে পরিণত হবে, তখন সেই সড়ক কোনো কাজে আসবে না।