দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র নয়; এগুলো জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা উপাচার্যদের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘিরে আবারও পুরোনো বিতর্ক সামনে এসেছে—বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য কি যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?
সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান পদেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ঘোষিত নামগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষকসংগঠনের সাবেক বা বর্তমান নেতা। এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে, উপাচার্য নিয়োগে কি সত্যিই স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে?
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় এই বিতর্ক নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তাদের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে বসিয়ে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও উপাচার্য নিয়োগে দলীয় প্রভাবের বাইরে বের হওয়া যায়নি। বর্তমান নিয়োগ নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে। ফলে রাজনৈতিক পালাবদল হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে না—এমন ধারণা আরও শক্ত হচ্ছে।
ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় চলে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী উপাচার্য নিয়োগের মূল বিধান হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে নির্বাচিত তিন সদস্যের একটি প্যানেল রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে এবং সেখান থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এ বিধানের উদ্দেশ্য ছিল উপাচার্য নির্বাচনে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
বাস্তবে দেখা যায়, এই বিধান প্রায় কখনোই কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হয় না। বর্তমান নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ আইন ও অধ্যাদেশে যে প্রক্রিয়া নির্ধারিত আছে, তা উপেক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে দুটি বড় সমস্যা তৈরি হয়। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটি দুর্বল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকসমাজের ভেতরে একটি বার্তা যায় যে পদোন্নতি বা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জ্ঞানচর্চা ও একাডেমিক সাফল্যের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অনেক শিক্ষকই গবেষণা বা একাডেমিক উৎকর্ষের পরিবর্তে শিক্ষকরাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন।
এই প্রবণতার প্রভাব শুধু উপাচার্য নিয়োগেই সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন নেতৃত্ব নির্বাচনে দলীয় আনুগত্য প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ে। শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি, হল ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, এমনকি উন্নয়ন প্রকল্প—সব ক্ষেত্রেই পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হয়। একসময় জ্ঞানচর্চার পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ শিক্ষা ও গবেষণা গৌণ বিষয় হয়ে যায়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতেই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা অপরাধ নয়। এটা সত্যি যে একজন শিক্ষক রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করতেই পারেন, এটি গণতান্ত্রিক সমাজে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নিয়োগের ক্ষেত্রে কি কোনো স্বচ্ছ বাছাইপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে? যোগ্যতা মূল্যায়নের জন্য কি কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছিল?
বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে মেধাভিত্তিক প্রশাসন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব নির্বাচন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। কিন্তু বাস্তবে যদি আগের ধারাই বজায় থাকে, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য।