গণতান্ত্রিক সহাবস্থান ফেরাতে হবে

মাত্র তিন দিনের মধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। গত সোমবার দিবাগত রাতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে উত্তেজনার সূচনা হয়। পরদিন মঙ্গলবার রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ এবং সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর গতকাল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও ‘অদম্য জুলাই’ শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সংঘর্ষের ঘটনা দেশবাসীকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় দেখা গেছে, একটি আলোচনা সভাকে ঘিরে শুরু হওয়া উত্তেজনা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়। পরে তা হাসপাতাল পর্যন্ত গড়ায়। একই দিনে ঢাকা কলেজ ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াতেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আলিয়া মাদ্রাসায় কক্ষ দখল, ভাঙচুর, এমনকি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের ওপর হামলার অভিযোগও উঠেছে। পরদিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ষপূর্তির শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে আবারও দুই ছাত্রসংগঠন মুখোমুখি অবস্থানে যায়। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন বহু শিক্ষার্থী এবং ক্যাম্পাসজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির ঠিক আগে আগে, এমনকি বর্ষপূর্তির দিনেও এই সংঘর্ষের ঘটনাগুলো ঘটছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও একদলীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা ও সন্ত্রাসের অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও ক্যাম্পাসকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনামলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্রলীগ সন্ত্রাস, দখলদারি এবং ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নের এক ভয়াবহ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিল। বহু বছর ধরে ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলো প্রকাশ্যে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি; হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সেই সন্ত্রাস ও দখলদারির অবসান ঘটানোর প্রত্যাশা থেকেই গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল।

দুঃখজনকভাবে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ধারাবাহিকতা সেই পুরোনো সহিংস রাজনীতির স্মৃতিকেই ফিরিয়ে আনছে। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, আধিপত্য বিস্তার কিংবা সাংগঠনিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার নামে যদি শিক্ষাঙ্গনে আবারও শক্তির প্রদর্শন শুরু হয়, তবে তা অতীতের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি হবে। ছাত্ররাজনীতিতে মতাদর্শগত প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু তার প্রকাশ কখনোই সহিংসতার ভাষায় হতে পারে না।

প্রতিটি সংঘর্ষের পেছনে দুই পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। কোথাও বহিরাগতদের উপস্থিতি, কোথাও কক্ষ দখল, কোথাও আবার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা টেন্ডার-সংশ্লিষ্ট অসন্তোষের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু কোনো পক্ষই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার রাখে না। তাই প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আহত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষাঙ্গন জ্ঞানচর্চা, বিতর্ক ও মতের বহুমাত্রিকতার স্থান। সেখানে ভয়, সহিংসতা ও প্রতিশোধের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যৎ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। সেই শিক্ষা বিস্মৃত হলে গণ-অভ্যুত্থানের অর্জনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

এ রকম অবস্থায় ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ সব ছাত্রসংগঠনকে সংযম প্রদর্শন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং সরকারকে শিক্ষাঙ্গনে সহিংস রাজনীতির পুনরুত্থান রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা করতে হলে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা নয়, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের পথে ফিরিয়ে আনতে হবে।