সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনস্বাস্থ্যবিদেরা সতর্ক করে আসছেন যে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি ভাইরাসজনিত ও নগরকেন্দ্রিক রোগ নয়; অনেক বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়, প্রাণহানি, হঠাৎ পরিজন হারানোর পারিবারিক ট্র্যাজেডি—সব মিলিয়ে ডেঙ্গু নাগরিকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া, দীর্ঘ গরমকাল এবং ঘনবসতিপূর্ণ বসতি ও দ্রুত নগরায়ণের সব কারণই বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বাহক এডিসজাতীয় মশা বিস্তারের জন্য উপযোগী শর্ত। অথচ বাংলাদেশে মশা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি মূলত মৌসুমভিত্তিক ও নগরকেন্দ্রিক। মশা নিয়ন্ত্রণের এমন সনাতনী কৌশল থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞানসম্মত, সমন্বিত ও বছরব্যাপী কর্মসূচি না নেওয়া গেলে ডেঙ্গু যে কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ দিচ্ছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৫৬২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, মারা যান ৪১২ জন। ২০২৪ সালে এক লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন, ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালটি ছিল ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ (৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন) ও রেকর্ড প্রাণহানির (১ হাজার ৭০৫ জন) বছর। সে বছর ডেঙ্গুর কারণে পুরো স্বাস্থ্য অবকাঠামো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল।
এ প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া রোধে সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি শুরু করেছে। আমরা মনে করি, এর মধ্য দিয়ে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ যে বছরব্যাপী কাজ, তার স্বীকৃতি মিলেছে। তবে ডেঙ্গু–চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ কিংবা শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করে সম্মিলিত প্রতিরোধই কার্যকর ফল দিতে পারে।
শক সিনড্রোম, হেমোরেজিক ধরনের ডেঙ্গু বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি হয়। দেরিতে চিকিৎসা শুরু হওয়ায় এবং সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক বেড়ে যায়। বর্তমানে ডেঙ্গু আর ঢাকা, চট্টগ্রাম নগরকেন্দ্রিক রোগ নয়; গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। শহর ও গ্রামের নিম্ন আয় ও মধ্য আয়ের মানুষের চিকিৎসার ভার লাঘবে মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে রোগ শনাক্ত এবং জটিল রোগীদের জন্য আইসিইউসহ চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নত ও সহজলভ্য করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হলো মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। মশা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় মন্ত্রণালয় এবং রোগ নজরদারি ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দায়িত্বে থাকলেও দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়ের উদ্যোগ ও ঘাটতি প্রবল। ফলে কেন্দ্রীয় সমন্বয় না থাকলে যে উদ্যোগই নেওয়া হোক, বাস্তবে তার সুফল কতটা মিলবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যাবে।
আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, কীটতত্ত্ববিদ এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ মোকাবিলায় উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় কমিটি করা প্রয়োজন। সবার আগে এটা মনে রাখা দরকার, সরকারের যেকোনো উদ্যোগে জনগণকে কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, তার ওপরই এর সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ভর করে।