গাজীপুরের ভাওয়াল বনাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বারবার আগুন লাগার ঘটনা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জমি দখলসহ নানা কারণে শীত শেষে শুষ্ক মৌসুমে প্রতিবছরই এই বনে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হলেও বন বিভাগের তৎপরতা হতাশাজনক।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত বুধবার (১১ মার্চ) শ্রীপুর উপজেলার বিন্দুবাড়ি এলাকায় শালবনসহ অন্তত পাঁচটি স্থানে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এসব আগুনে শুধু গাছপালা নয়, ধ্বংস হচ্ছে বনের ভেতরের অগণিত প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য।
বনের আগুন সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। বনের বাস্তুসংস্থানে ছোট কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী পর্যন্ত একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আগুন লাগলে এই সমগ্র ব্যবস্থাটিই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শুকনা পাতার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শাল ও গজারিগাছের নিচে জন্ম নেওয়া চারা গাছ পুড়ে যায়। আগুন লাগার সময় গুইসাপ, বেজি, শিয়াল, ইঁদুরসহ নানা প্রাণী প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে থাকে। অনেক প্রাণী আগুনে পুড়ে মারা যায়, আবার অনেক প্রাণী লোকালয়ে ঢুকে মানুষের হাতে প্রাণ হারায়।
স্থানীয় মানুষের বরাতে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ভাওয়াল বন দখলের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়। আবার কেউ পোড়া উদ্ভিদের অংশ সংগ্রহের জন্য আগুন দেয়। কোথাও কোথাও অসাবধানতাবশত জ্বলন্ত সিগারেটের অবশিষ্টাংশ থেকেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ মানুষের কর্মকাণ্ডই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাওয়াল বন একসময় বহু প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল ছিল। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখানে একসময় বহু স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, উভচর ও পাখির উপস্থিতি ছিল। কিন্তু গত দুই দশকে তাদের অনেকেই বিলুপ্তির পথে। বনে লাগা আগুন এ সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত বন দখল বা অন্য উদ্দেশ্যে আগুন দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বনাঞ্চলে নিয়মিত নজরদারি ও দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে একটি কার্যকর সচেতনতা কর্মসূচি গড়ে তোলা দরকার।
ভাওয়াল বন দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এই বন যদি ধীরে ধীরে আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়, তবে তার ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। ভাওয়াল বন ও এর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন বিভাগকে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।