সিটি করপোরেশনকে উদ্যোগ নিতে হবে

সম্পাদকীয়

রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের এখন মশার কামড় খাওয়া এবং হাত-পা নেড়ে মশা তাড়ানোর দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ঢাকার সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি। কয়েল, অ্যারোসল, মশারি—সবকিছুর পরও যখন মশার আক্রমণ ঠেকানো যায় না, তখন বোঝা যায় সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক। সর্বশেষ গবেষণা বলছে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং এর ৯০ শতাংশই কিউলেক্স। এক ঘণ্টায় ৮৫০টি মশার উপদ্রব—এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতীক।

গবেষণার তথ্য বলছে, অস্বাভাবিক হারে মশা বৃদ্ধির বিষয়টি উত্তরা থেকে মিরপুর, গুলশান থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া, শ্যামপুর বা সাভারের মতো এলাকায় মশার ঘনত্ব বেশি; অর্থাৎ নিম্নভূমি, দূষিত জলাশয় ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের সঙ্গে মশার বিস্তারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা তিনটি কারণ দেখিয়েছেন: কম শীত ও দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নর্দমা-জলাশয়ের দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে শূন্য দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। তাপমাত্রা বাড়লে কিউলেক্সের জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হয়, স্ত্রী মশার রক্তপানের প্রবণতা বাড়ে, ডিম উৎপাদন বাড়ে—ফলে বিস্তারও বাড়ে।

আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই; হাতে আছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলাশয় রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি। এখানে প্রশাসনিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। ডিএনসিসি এলাকায় প্রায় আট হাজার বিঘা জলাশয়, যার বড় অংশ মশার প্রজননক্ষেত্র। একবার পরিষ্কার করলেই যদি আবার আবর্জনায় ভরে যায়, তবে প্রশ্ন হলো নিয়মিত তদারকি কোথায়? কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আইনের প্রয়োগ নেই কেন? সিটি করপোরেশন কাজ করতে না পারলে সমন্বয়হীনতার দায় কে নেবে? জনপ্রতিনিধি না থাকায় জনসম্পৃক্ততা কম—এ যুক্তি আংশিক সত্য হতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামো তো অচল থাকার কথা নয়।

ঢাকায় মশা এখন মৌসুমি দুর্ভোগ নয়, প্রায় সারা বছরের যন্ত্রণা। ব্যক্তিপর্যায়ে কয়েল বা অ্যারোসল দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত নগর–পরিকল্পনা, বদ্ধ জলাশয়ের তালিকা করে নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব কাজে জনসম্পৃক্ততা। ওয়ার্ডভিত্তিক কমিউনিটি মনিটরিং ও তথ্যপ্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে, যাতে নাগরিকেরা জানতে পারেন তাঁদের এলাকায় পরিস্থিতি কতটা গুরুতর।

এক ঘণ্টায় ৮৫০টি মশার উপদ্রব শুধু অস্বস্তি কিংবা রোগের আশঙ্কা নয়; এটি আমাদের নগর–পরিচালনার নিদারুণ ব্যর্থতার চিত্র। অল্প কয়েক দিন আগে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সরকারের উচিত হবে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া; সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা এবং নগরবাসীকে মশার যন্ত্রণা থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করা।