সরকারকে অবশ্যই কার্যকর পথ খুঁজতে হবে

সম্পাদকীয়

গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাটা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তরাধিকার সূত্রেই জ্বালানিসংকট ও বিশাল বকেয়ার বোঝা বহন করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতকে। এ বাস্তবতায় লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে দেশ পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন জ্বালানিবিশেষজ্ঞরা। আমরা মনে করি, গ্রীষ্ম মৌসুমের বিদ্যুৎ–সংকট মোকাবিলায় সরকারের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, সরকারি–বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা জমেছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। ভারতের আদানির পর বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পাওনা আদায়ে সরকারকে চাপ দিচ্ছে। তারা বলছে, বকেয়া না পেলে জ্বালানি কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে না। এ ছাড়া গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে ১৬ হাজার কোটি টাকা গ্যাস বিল বকেয়া জমেছে। সব মিলিয়ে গাস, কয়লা ও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র—তিন ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সংকট রয়েছে।

দেশে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে। শীত মৌসুমের তুলনায় গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা দিনে চার–পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বেড়ে যায়। গরমের কারণে গৃহস্থালিসহ ভোক্তাপর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। আবার এ সময়টা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বোরো ধানের উৎপাদনের মৌসুমও। ফলে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি বাড়লে একদিকে যেমন জন–অসন্তোষ তৈরি হতে পারে; অন্যদিকে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা–বাণিজ্য ও বোরো উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গ্যাস, কয়লা, ফার্নেস তেলসহ জ্বালানির প্রাথমিক উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। দেশি–বিদেশি বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থে নাগরিকদের স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে এ খাতে চুক্তি করা হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবতা হলো সর্বোচ্চ চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।

দায়মুক্তি আইন করে বিদ্যুৎ খাতের লুটপাট ও অব্যবস্থাপনাকে বৈধতা দেওয়ার যে আইনি ব্যবস্থা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের বৃত্ত থেকে বের করে আনার কার্যকর কোনো কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। বরং সংকট দেখে সমাধানের তাৎক্ষণিক নীতি নেওয়া হয়েছিল।

নতুন সরকারকে অবশ্যই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকট এবং অব্যবস্থাপনা থেকে বের করে আনতে হবে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও পরিকল্পনা নিতে হবে। স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই বলেই আমরা মনে করি। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিস্যা বাড়াতে হবে। তবে আশু করণীয় হিসেবে সরকারকে গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার বাস্তবম্মত ও কার্যকর পথ খুঁজে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে পাকিস্তান–আফগানিস্তান সংঘাত এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতে নতুন করে জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় কি না, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং ব্যবসা–বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা বিএনপি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এর জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করাটা জরুরি। লোডশেডিংয়ের কারণে যেন কোনোভাবেই কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে সংকট তৈরি না হয়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।