ভোগের চেয়ে বড় হয়ে উঠুক ত্যাগের অর্থ

সম্পাদকীয়

ইসলামের যে পাঁচটি স্তম্ভ মানবজীবনের আধ্যাত্মিক ভিত্তি নির্মাণ করে, তার একটি হজ। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের জন্য এই যাত্রা কেবল ধর্মীয় আচার নয়; বরং নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের পথ। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ যখন মক্কার আরাফাতের ময়দানে একত্র হন, তখন তাঁরা কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়; বরং এক মানবসমষ্টির অংশ হিসেবে দাঁড়ান। এই হজেরই এক অন্তর্নিহিত প্রতীক কোরবানি। কোরবানি শুধুই পশু জবাইয়ের আচার নয়; বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও গভীর দর্শন। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রতি প্রিয়তম বস্তুকে ত্যাগ করার যে ঐশী আদেশ, তা আসলে মানুষের ভেতরের আসক্তি, অহং এবং স্বার্থপরতাকে অতিক্রম করারই আহ্বান।

এই কারণে কোরবানি কেবল হাজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সারা বিশ্বের সামর্থ্যবান মুসলমানরা এই ইবাদতে অংশ নেন। এর মধ্য দিয়ে যে সামাজিক দর্শনটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তা হলো মানুষ একা নয়; তাঁর সম্পদের মধ্যেও অন্যের অধিকার জড়িয়ে আছে। যে মাংস বিতরণ করা হয়, তা কেবল দান নয়; বরং একটি ন্যায়বোধের স্বীকৃতি। এখানে দারিদ্র্য দূর করার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সম্মিলিত অস্তিত্বের স্বীকৃতি।

এই উৎসবের আরেকটি বাস্তব দিকও আছে, যা আমাদের অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আধুনিক সমাজে কোরবানির আয়োজন যত বড় হয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক দায়িত্বের প্রশ্ন। উন্নত বিশ্বের বহু দেশে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে কোরবানি সম্পন্ন হয়, যাতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট না হয়। আমাদের দেশেও এই সচেতনতা ধীরে ধীরে বাড়ছে, কিন্তু এখনো অনেক পথ বাকি। কোরবানির বর্জ্য, রক্ত, চামড়া—এসবের ব্যবস্থাপনা কেবল পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়; বরং সভ্যতার প্রতিফলন।

অন্যদিকে কোরবানির অর্থনীতি আমাদের সমাজের আরেকটি স্তরকে উন্মোচন করে। কৃষক ও খামারিরা যে পশু লালন-পালন করেন, তা কেবল একটি ধর্মীয় চাহিদা পূরণের জন্য নয়; বরং তা জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দেশের ভেতরেই পশু উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া একদিকে যেমন আত্মনির্ভরতার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে চামড়াশিল্পের সম্ভাবনাও উন্মোচন করে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয় তখনই, যখন আমরা সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সচেতন হই।

ঈদের সময় শহর থেকে গ্রামে ফেরার যাত্রা আনন্দের হলেও তা কখনো কখনো হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। গতকাল সোমবার টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। এই মর্মান্তিক সংবাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উৎসবের উচ্ছ্বাসের মাঝেও জীবনের অনিশ্চয়তা লুকিয়ে থাকে। এই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই মানুষের সতর্কতা ও দায়িত্ববোধের পরীক্ষা হয়।

সবশেষে ফিরে আসতে হয় মূল কথায়—ত্যাগ। কিন্তু এই ত্যাগ কি কেবল বাহ্যিক? নাকি এটি মানুষের অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা লোভ, হিংসা ও অহংকারকে পরিত্যাগ করার আহ্বান? ঈদুল আজহা তাই কেবল আনন্দের দিন নয়, এটি এক নীরব আত্মজিজ্ঞাসা—আমরা কি ত্যাগ করতে পারলাম? আমরা কতটা মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারলাম? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করে উৎসবের প্রকৃত অর্থ।

এই উপলব্ধির মধ্য দিয়েই আমাদের সব পাঠক, লেখক, গ্রাহক, হকার, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।