তাপপ্রবাহে স্কুল খোলা নিয়ে কেন বিভ্রান্তি

সম্পাদকীয়

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে তিন ধরনের নির্দেশনা পাওয়া গেছে গতকাল সোমবার, যা নিয়ে শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তো বটেই; দেশবাসীর মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা দারুণ উৎকণ্ঠায় আছেন।

ঈদের ছুটি শেষ হতে না হতেই তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দেয়। এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি সাত দিন বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেই মন্ত্রণালয় রোববার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ও তাদের অনুসরণ করেছে। তারা এই সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছে, তখন দেশে ৭৬ বছরের মধ্যে রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ চলছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রথম দিনে বেশ কিছু শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঢাকাসহ পাঁচটি জেলায় সোমবার তাদের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয়। যদিও ওই দিন সব জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা ছিল।

একই দিন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সংবাদমাধ্যমে আসা খবর আমলে নিয়ে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। অবশ্য এই সময়ে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পাবলিক পরীক্ষা, এ লেভেল, ও লেভেল পরীক্ষা নিতে পারে। আর যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠান চাইলে এই সময়ে খোলা রাখতে পারে।

সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তাদের অধীনে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে, সেটা উচ্চ আদালতের রায়ের অনুরূপ।

কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বলেছে, ৩০ এপ্রিল ২৭ জেলায় তাদের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। উল্লিখিত জেলা হলো খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের সব জেলা এবং ঢাকা বিভাগের ঢাকা, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ, রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুর এবং বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী।

তারা কিসের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিল? আবহাওয়া অধিদপ্তর সোমবার থেকে যে নতুন করে তিন দিনের ‘হিট অ্যালার্ট’ জারি করেছে, তা পুরো দেশের জন্যই প্রযোজ্য। তাহলে এই মুহূর্তে ২৭ জেলার বাইরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। আর যুক্তির কথা বাদ দিলেও উচ্চ আদালত যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া) বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা অগ্রাহ্য করতে পারবে কি? শিক্ষামন্ত্রী কোনো বিশেষ এলাকায় তাপপ্রবাহের কারণে সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না রাখার কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে ২৭ জেলার বাইরে তাপপ্রবাহ চলছে না?

আবহাওয়াবিদেরা যখন বলছেন ২ মের আগে বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের উচিত ছিল ২ মে পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ মান্য করা। ১ মে মহান শ্রমিক দিবস উপলক্ষে বন্ধ থাকবে। সে ক্ষেত্রে ৩০ এপ্রিল ২৭ জেলার বাইরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা তুঘলকি সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছু নয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক দিন বন্ধ থাকলে ছুটির দিনে ক্লাস করেও সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু তাপপ্রবাহের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার কারণে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুষিয়ে নেওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। যেখানে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে, সেখানে গোঁয়ার্তুমি দেখানোর সুযোগ আছে বলে মনে করি না।