প্রান্তিক গ্রাহকের স্বস্তি মিললেও সংস্কার জরুরি

সম্পাদকীয়

জ্বালানি তেলের মূল্য দুই দফা বাড়ানোর পর বিদ্যুতের দামও এক দফায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়ানো হলো। সরকারের এই সিদ্ধান্তে নিশ্চিত করেই মূল্যস্ফীতি আরও এক দফা উসকে দেবে, বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা টানা মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে রীতিমতো গলদঘর্ম মানুষের ওপর এই সিদ্ধান্ত আরও চাপ তৈরি করবে। তবে ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে, সব শ্রেণির গ্রাহকের জন্য দাম বাড়ানোর এক দিনের মাথায় নতুন দাম সংশোধন করে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের বিদ্যুতের বিল আগের দামেই রাখা হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার হঠাৎ বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। গত মার্চ মাসের শুরুতেও বলা হয়েছিল, আপাতত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। কিন্তু এপ্রিল মাসেই বিদ্যুতের দাম বাড়াতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল, বাড়ানো হয়েছে ২০ শতাংশ, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি।

এটা সত্যি যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অভাবনীয় বৈশ্বিক জ্বালানিবাজার ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে যে অভাবনীয় অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাতে করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। তবে এক ধাপে ২০ শতাংশ দাম বাড়ানোর কারণে ধাক্কাটাও বেশি পড়বে। সরকারকে অবশ্যই কৌশলগত পণ্য জ্বালানির পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে যে অভিঘাত তৈরি হবে, তা থেকে দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও পরিধি বাড়াতে হবে।

আবাসিকে সাত শ্রেণির গ্রাহকের মধ্যে লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত প্রথম দুটি শ্রেণির গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আবাসিকে মোট বিদ্যুতের গ্রাহকের ৬৫ শতাংশই প্রান্তিক এ দুটি শ্রেণির। আশা করা যায়, এতে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলবে। তবে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশের জীবনযাত্রার ওপর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে। আমরা মনে করি, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রেও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধির পরও সরকারকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। এই চিত্রই বলে দেয়, আমাদের বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার শিকড় কতটা গভীরে পৌঁছেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে দেশি–বিদেশি কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থে সামষ্টিক স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক জ্বালানির উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট; বছরের অধিকাংশ সময় অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কাজেই লাগে না। অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ ঠিকই পরিশোধ করতে হয়।

বাস্তবে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির বড় অংশই চলে যায় ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে। অথচ নিম্ন আয়ের মানুষ, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—যাঁদের জন্য এই ভর্তুকি সবচেয়ে বেশি জরুরি, তাঁরাই বঞ্চিত হন। বিদ্যুৎ খাতকে এই বৈষম্যমূলক ও লুণ্ঠনমূলক কাঠামো থেকে মুক্তি না দিতে পারলে ফি বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ আমলে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি কমানোর একই যুক্তিতে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল।

আমরা মনে করি, বিদ্যুৎ খাতের অপচয়, দুর্নীতি, অযৌক্তিক ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ না করে জনগণের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দেওয়ার সহজ আমলাতান্ত্রিক সমাধানের পথ থেকে বের হয়ে আসা জরুরি কর্তব্য। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পথরেখা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।