একটি দেশের রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কতটা খারাপ হতে পারে, তার নগ্ন দৃষ্টান্ত হতে পারে ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান কেন্দ্র মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল। ময়লার ভাগাড়টি নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। এটি এখন দক্ষিণ ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ আগুন এবং তার পরবর্তী বিষাক্ত ধোঁয়া ডেমরা ও মাতুয়াইল এলাকার আকাশকে যে ধূসর চাদরে ঢেকে দিয়েছে, তা বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি করেছে। রাজধানীর পরিবেশ ও বায়ুদূষণে ময়লার ভাগাড়গুলো যে উদ্বেগ তৈরি করেছে, তা কোনোভাবে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।
১৮১ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই ল্যান্ডফিলটি বর্তমানে একটি ‘বিপজ্জনক হটস্পট’। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখান থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৪ হাজার কেজি মিথেন নিঃসরণ হয়, যা প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সাধারণ গাড়ি চালানোর সমান ক্ষতিকর। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুযায়ী, ময়লা ফেলার পর তা মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়ার কথা থাকলেও বাজেট ও জনবল–স্বল্পতার অজুহাতে তা করা হচ্ছে না। ফলে জমে থাকা মিথেন গ্যাস সূর্যের তাপে জ্বলে উঠছে, যা নেভাতে গিয়ে খোদ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিষাক্ত লিচেট বা বর্জ্যের তরল মিশছে পাশের জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ পানিতে, যা দীর্ঘ মেয়াদে পুরো এলাকার বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য হলো এই নরককুণ্ডের ভেতরে শিশুদের বিচরণ। যেখানে মাস্ক ছাড়া প্রাপ্তবয়স্কদের টিকে থাকা দায়, সেখানে মাসুম শিশুরা খালি হাতে লোহা ও প্লাস্টিক কুড়াচ্ছে। আশপাশের বাসিন্দারা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ও মাথাব্যথায় ভুগছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর বারবার চিঠি দিয়ে দায় সারলেও সিটি করপোরেশনের কাজে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই। জাইকা প্রদত্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ড্রোনগুলো দক্ষ জনবলের অভাবে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। এটি স্পষ্টতই অব্যবস্থাপনার এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
বর্জ্য পোড়ানো দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও সরকারি ল্যান্ডফিলেই আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বর্জ্য থেকে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনার কথা বারবার বলা হয়, তা আজও কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে বুঝতে হবে, বর্জ্য ডাম্পিং মানে কেবল ময়লা ফেলে রাখা নয়; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
আমরা মনে করি, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল নিয়ে এ অবহেলা আর চলতে পারে না। অবিলম্বে ল্যান্ডফিলটিকে আধুনিক ‘স্যানিটারি’ রূপ দিতে হবে, মিথেন গ্যাস আহরণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং বর্জ্য পুড়িয়ে বায়ুদূষণকারী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। নগর–পরিকল্পনাবিদদের ভাষায়, জনগণকে নিয়ে এমন ‘তামাশা’ বন্ধ হওয়া জরুরি। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে মাতুয়াইলকে অভিশাপমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।