কক্সবাজারের পাহাড় ও বনাঞ্চলে একের পর এক সড়ক নির্মাণের ধ্বংসাত্মক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে চকরিয়ার শতবর্ষী হারবাং সংরক্ষিত বনের বুক চিরে ২৫ কোটি টাকার পাকা সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। এ ঘটনা আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও পরিবেশগত উদাসীনতার এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। এ সড়ক নির্মাণের ফলে সেখানকার হাতির বিচরণ বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে। সড়কটি সম্ভাবনার বদলে যে চরম সংকট ডেকে আনবে, তা খুবই উদ্বেগজনক।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়াই এলজিইডি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বনের ভেতরের পাহাড় কেটে, বিরল গর্জনগাছ ধ্বংস করে গড়ে তোলা এই সড়ক শুধু বৃক্ষনিধনই নয়; দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বনাঞ্চল ও বন্য প্রাণীর অস্তিত্বের ওপরও এক মারাত্মক আঘাত। আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই, অথচ সেই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই এ উন্নয়ন করা হচ্ছে।
সংরক্ষিত বনাঞ্চল কোনো বিনোদন পার্ক বা সাধারণ সরকারি জমি নয়, এটি বন্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল। হারবাংয়ের এই বনে এশীয় হাতির অবাধ বিচরণ রয়েছে এবং পাশাপাশি ৫০ একরের সুফল বনায়ন গড়ে তোলা হয়েছে। বনের ভেতর দিয়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ থেকে ১২ ফুট চওড়া পাকা সড়ক তৈরি হলে যানবাহন ও মানুষের অবাধ আনাগোনা বৃদ্ধি পাবে। এতে গাছ চুরি, বন্য প্রাণী শিকার ও বনভূমি জবরদখলের মহোৎসব শুরু হতে বাধ্য। সর্বোপরি বিচরণপথ ও চলাচলের করিডর খণ্ডিত হওয়ায় হাতি বসতবাড়িতে হানা দেবে, যা মানব–হাতি দ্বন্দ্বকে আরও সহিংস রূপ দেবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বন বিভাগের পক্ষ থেকে কাজ বন্ধের লিখিত নির্দেশ দেওয়ার পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ চালিয়ে গেছে। কেবল হারবাং নয়, চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জনবন, সাতকানিয়ার বৈতরণি এবং মহেশখালীর শাপলাপুর সংরক্ষিত বনেও প্রায় একই কায়দায় পাকা সড়ক বানানোর চেষ্টা চলছে, যা কোনোভাবেই মানা যায় না। প্রকল্পের ভুল স্বীকার করে উন্নয়ন কর্মকর্তা কাজের দায় এড়াতে চাইলেও যে প্রাকৃতিক ক্ষতি ইতিমধ্যে সাধিত হয়েছে, তার দায়ভার কে নেবে?
সংরক্ষিত বনের সীমান্ত ঘেঁষে বা ভেতরের সমস্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প এখনই স্থায়ীভাবে স্থগিত করতে হবে। যেসব কর্মকর্তা পরিবেশগত সমীক্ষা ও আইন অমান্য করে এই প্রকল্প অনুমোদন করেছেন, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।