উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করুন

সম্পাদকীয়

জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ছাড়া নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অনেক কিছুই নিশ্চিত করা এখন অসম্ভব। জন্মনিবন্ধন তো একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রাথমিক ভিত্তি। আর মৃত্যুনিবন্ধন পরিবারকে অনেক আইনি জটিলতা থেকে রেহাই দেয়। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নিয়ে নানা সময়ে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কথা আমরা জেনে থাকি। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নিয়ে যে জালিয়াতি ঘটেছে, তা শুধু বিস্ময়করই নয়; বরং শিউরে ওঠার মতো। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতা ও অনিয়মের ঘটনা অনভিপ্রেত। এটি কোনোভাবেই মানা যায় না।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী মা ১৯টি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এবং তাদের বেশির ভাগই জন্মের কয়েক দিনের মাথায় মারা গেছে—এমন অলীক ও ভৌতিক তথ্য সরকারি ডেটাবেজে শোভা পাচ্ছে। আরও বিচিত্র বিষয় হলো, সেই তালিকায় নাম আছে ‘মুকেশ আম্বানি’ থেকে শুরু করে ‘বেল পরী’ কিংবা ‘ডিবজল খান’-এর মতো কাল্পনিক সব চরিত্রের। আপাতদৃষ্টে একে চরম হাস্যকর মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় তথ্যভান্ডার নিয়ে এক ভয়াবহ জালিয়াতি এবং প্রশাসনিক দেউলিয়াত্ব।

তৃণমূল পর্যায়ে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ তদারক করে স্থানীয় সরকার ও রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদগুলোয় ওপর মহল থেকে নির্দিষ্ট ‘লক্ষ্যমাত্রা’ বা টার্গেট পূরণের এক প্রচণ্ড চাপ থাকে। কোন জেলা বা উপজেলা নিবন্ধনে কত এগিয়ে, তার ওপর ভিত্তি করে পুরস্কার বা তিরস্কার জোটে। এই ‘টার্গেট গেম’-এ নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতে গিয়ে ইউপি সচিব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশ্রয় নিচ্ছেন চরম জালিয়াতির। তথ্যভান্ডারে থাকা প্রকৃত ব্যক্তিদের অজান্তেই তাঁদের আইডি ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে কাল্পনিক দম্পতি এবং তাঁদের নামে নিবন্ধিত হচ্ছে ভুয়া নবজাতক। খরচ বাঁচাতে আবার জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যেই তাদের ‘মৃত’ দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কারণ, এ সময়ের মধ্যে নিবন্ধন করতে কোনো ফি লাগে না।

এই জালিয়াতি কেবল সংখ্যা বাড়ানো বা পুরস্কার পাওয়ার বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য এক অশনিসংকেত। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই একটি দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের বাজেট প্রণীত হয়। যদি সরকারি পরিসংখ্যানে এভাবে কয়েক হাজার ভুয়া মানুষের তথ্য ঢুকে পড়ে, তবে পুরো পরিকল্পনাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এর চেয়েও বড় বিপদের কথা হলো, এই ছিদ্রপথ ব্যবহার করে অপরাধী বা ভিনদেশি নাগরিকদের (যেমন রোহিঙ্গা) ভুয়া পরিচয়পত্র পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম ঝুঁকি।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভূমিকা। যখন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য নিচুতলার কর্মকর্তাদের ওপর ‘রোলারকোস্টার’ চালানো হয়, তখন জালিয়াতির দায় আর কারও একার থাকে না। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধে রূপ নেয়। জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন একটি স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব হওয়া উচিত। একে কেবল সরকারি ডিক্রি দিয়ে টার্গেট পূরণের বস্তুতে পরিণত করা এক মারাত্মক ভুল নীতি।

আমরা মনে করি, অবিলম্বে এই ভুয়া নিবন্ধনগুলোর শুদ্ধি অভিযান শুরু করা জরুরি। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয়, সারা দেশেই এই জালিয়াতির জাল কত দূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। যাঁরা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সংখ্যার পেছনে না ছুটে গুণগত ও সঠিক তথ্য নিশ্চিত করার দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে।