এটা অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত

সম্পাদকীয়

জাতীয় চিড়িয়াখানার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা নতুন নয়। বিশেষ করে প্রতিদিন কত দর্শনার্থী চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করবে, সেটি যৌক্তিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। চিড়িয়াখানায় পশুপাখির জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। এ প্রেক্ষাপটে চিড়িয়াখানার হ্রদে নৌকাভ্রমণের আয়োজন করে আরও বেশি দর্শনার্থী আকর্ষণের চেষ্টা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে জেটি, সংযোগ সড়ক, যাত্রীছাউনি নির্মাণ এবং দুটি বোট কেনা হয়েছে গত জুনের আগেই। কিন্তু চরম পরিহাসের বিষয় হলো কেনাকাটার পর কর্তৃপক্ষের হুঁশ হয়েছে যে কেনা নৌকাগুলোর ইঞ্জিনের বিকট শব্দ প্রাণীদের জন্য ক্ষতিকর এবং এতে পানি দূষিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে! অপরিকল্পিত কেনাকাটা এবং যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া ৩৫ লাখ টাকার মতো বিপুল সরকারি অর্থ এভাবে ফেলে রাখার দায় কার? এখন অবিক্রীত সেই নৌকার জন্য শব্দহীন ইঞ্জিনের ব্যর্থ খোঁজাখুঁজি করে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে, যা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক হঠকারিতাকেই স্পষ্ট করে।

তবে বিষয়টির গভীরতা কেবল নৌকার ইঞ্জিনের শব্দে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাণিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা যথার্থই প্রশ্ন তুলেছেন—জাতীয় চিড়িয়াখানার মতো কৃত্রিম হলেও একটি সংবেদনশীল সংরক্ষিত স্থানে নৌকাভ্রমণের এই আয়োজন আদৌ কতটা যৌক্তিক? ৩২ একর আয়তনের ওই দক্ষিণ হ্রদ কেবল এক জলাশয় নয়; সেখানে বহু জলজ পশুপাখির আবাসস্থল ছিল এবং একসময় প্রচুর পরিযায়ী পাখি সেখানে শীতের আশ্রয়ে আসত। যান্ত্রিক কোলাহল, বাণিজ্যিক উন্মাদনা আর কায়িক উপস্থিতি দিয়ে হ্রদের পরিবেশ নষ্ট করলে বন্য প্রাণীরা ভীতির মুখোমুখি হবে এবং পরিযায়ী পাখিদের আসার পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।

মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানার হ্রদে দর্শনার্থীদের নৌকাভ্রমণের সুবিধা দিতে যে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, তা চিড়িয়াখানার মূল কাঠামোর সঙ্গে চরম সাংঘর্ষিক। একটি সুরক্ষিত চিড়িয়াখানার প্রাথমিক দায়িত্ব যেখানে প্রাণীদের মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য বজায় রাখা, সেখানে হ্রদের বুকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নামানোর এই প্রচেষ্টা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

চিড়িয়াখানাকে সাধারণ মানুষের জন্য শুধু ‘বিনোদন পার্ক’ হিসেবে দেখার ধারণা থেকে কর্তৃপক্ষকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা মনে করি, প্রাণীর স্বস্তি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা বিবেচনায় না নিয়ে নেওয়া এই প্রকল্প থেকে সরে এসে হ্রদের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই হবে যুক্তিসংগত। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের এমন অপরিণামদর্শী বাণিজ্যিক উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।