ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আমরা আশা করি, একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অঙ্গীকারের কথা জানান।
এবারের জাতীয় নির্বাচন নানা রাজনৈতিক তাৎপর্যের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। বিগত সরকারের আমলে পরপর তিনটি বিতর্কিত ও কারসাজির নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে অবরুদ্ধ করে দিয়েছিল। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দেশকে কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে বের করে নতুন করে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এই তিনকে অগ্রাধিকার দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়। ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করলে নির্বাচন নিয়ে সংশয় ও অনিশ্চয়তর অবসান হয়।
গত দুই মাসে, বিশেষ করে ২২ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকেরা প্রচার-প্রচারণার মধ্য দিয়ে দেশে সত্যিকারের একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী আবহ তৈরি করেন। মঙ্গল ও বুধবার ঢাকাসহ বড় শহরগুলো থেকে মানুষ ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে যেভাবে বাড়ির দিকে ছুটেছেন, তা প্রমাণ করে, গণতন্ত্রের প্রতি দেশের মানুষের নিরঙ্কুশ আস্থা।
গত মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সপরিবার উৎসবমুখর পরিবেশে উপস্থিত হয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা জানান তিনি।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিশ্চিত করা হয়েছে প্রযুক্তিগত নজরদারিও। ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশসহ প্রায় সাড়ে ৯ লাখ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কারচুপি ও অনিয়ম ঠেকাতে প্রায় সব ভোটকেন্দ্রে ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে থাকবে ‘বডি-ওর্ন’ ক্যামেরা। ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি ও অভিযোগ জানাতে নির্বাচনী সুরক্ষা অ্যাপ রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তাগত প্রস্তুতি ও প্রযুক্তিগত নজরদারির সঙ্গে ভোটাররা যাতে ভয়হীন পরিবেশে ভোট প্রদান করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো অনিয়ম ও সহিংসতার বিরুদ্ধে ত্বরিত, কঠোর ও বিচক্ষণ পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে মনে রাখতে হবে যে তফসিল ঘোষণার পর গত দুই মাসে দেশে ২৩৭টি সহিংসতা হয়েছে। এসব সহিংসতায় ১৭ জন নিহত ও ১ হাজার ১০৯ জন আহত হয়েছেন। বাস্তব জগতের সহিংসতার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে গুজব ও অপতথ্য ছড়াতে না পারে, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। শুধু ভোট গ্রহণ নয়; ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো সহিংসতা ও অনিয়ম না হয়, তার জন্যও সজাগ থাকতে হবে।
বাংলাদেশে নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তার প্রতি রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন ও ভোটার—সবাইকে শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর নির্বাচনই আমাদের প্রত্যাশা।