ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরগুলো আবারও ডুবে গেছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ ধানখেত পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে কৃষকদের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতি নতুন নয়, বরং দুঃখজনকভাবে এটি এখন নিয়মিত এক বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, কেন বছরের পর বছর একই ধরনের পূর্বানুমেয় ঝুঁকির মুখে আমাদের কৃষকদের একাই লড়াই করতে হচ্ছে?
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বোরো ধানই মূল ফসল, যা তাঁদের বছরের প্রধান এবং অনেক ক্ষেত্রে একমাত্র আয়ের উৎস। এই ফসল কাটার ঠিক আগমুহূর্তে যখন পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন তা শুধু ফসলের ক্ষতি নয়; বরং পুরো বছরের জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য ধসে পড়ে। সুনামগঞ্জে অন্তত ২৫টি হাওরের ধানখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি হিসাবে ৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমি তলিয়ে গেলেও মাঠের বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। স্থানীয় মানুষের দাবি, প্রায় অর্ধেক ফসলই নষ্ট হয়ে গেছে।
একই চিত্র কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারেও। কোথাও শ্রমিকসংকট, কোথাও জলাবদ্ধতার কারণে যন্ত্রচালিত হারভেস্টার অচল, আবার কোথাও কাটা ধান শুকানোর সুযোগ না থাকায় তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধা পাকা ধান কাটছেন, আবার কেউ কেউ ভেজা ধান কম দামে বিক্রি করছেন। কেউ কেউ ঋণ নিয়ে চাষ করে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। এই মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিটি গল্পই রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে আসে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো এই সংকট মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। এক দশক ধরে আগাম বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা হাওরাঞ্চলের কৃষির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ ও ২০২২ সালের ভয়াবহ ক্ষতির অভিজ্ঞতা এখনো তাজা। তবু কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? দুর্বল ও অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ, সময়মতো মেরামতের অভাব, নিম্নমানের নির্মাণকাজ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রতিবছরই সামনে আসে। সুনামগঞ্জে সাম্প্রতিক বাঁধ ভাঙার ঘটনায় আবারও সে প্রশ্ন জোরালো হয়েছে—বাজেট বরাদ্দ থাকলেও কাজের মান ও জবাবদিহি কোথায়?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সহায়তার অভাব। হাওরাঞ্চলে ধান শুকানো ও সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা নেই, নেই দ্রুত ফসল তোলার জন্য সংগঠিত শ্রমব্যবস্থা। ফলে আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনেই পুরো ফসল ঝুঁকির মুখে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। প্রথমত, দ্রুত শ্রমিক মোতায়েন ও যান্ত্রিক সহায়তা বাড়িয়ে অবশিষ্ট ফসল রক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভেজা ও ক্ষতিগ্রস্ত ধানের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কৃষকেরা মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণের শিকার না হন।
সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে—এটি ইতিবাচক। কিন্তু এসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু–সহনশীল অবকাঠামো, ফসলবিমা এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
হাওরের কৃষকেরা দান নয়, ন্যায্য অধিকার চান; নিরাপদে ফসল ফলানোর নিশ্চয়তা চান। হাওরের এই ধারাবাহিক বিপর্যয় কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। এই ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে প্রতিবছরই একই দৃশ্য ফিরে আসবে; পানির নিচে তলিয়ে যাবে শুধু ধান নয়, কৃষকের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার আশা।