জনপ্রশাসনে আস্থা তৈরি করতে হবে

জনপ্রশাসনের মূল কথা হলো দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও জনসেবা। এগুলো একজন কর্মকর্তা কতটা দায়িত্ব পালন করেন, তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। কিন্তু জনপ্রশাসনে এখন যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারও হাতে একসঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, আবার শত শত কর্মকর্তা আছেন, যাঁদের কার্যত কোনো কাজ নেই। এই দুই চিত্র একই সমস্যার দুই দিক।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবিরের কথাই ধরা যাক। নিজ দপ্তরের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের প্রধান। একই সঙ্গে কমিটি ও অর্থনৈতিক অনুবিভাগের প্রধান। একজন কর্মকর্তাকে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তিনি কি সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন? একই প্রশ্ন অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এটি শুধু কাজের চাপের বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রশাসনের দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতিও জড়িত। একজন কর্মকর্তার হাতে দায়িত্ব বেশি হলে প্রতিটি কাজে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া কঠিন। ফাইল আটকে থাকতে পারে। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হতে পারে। ফলে সরকারের নীতি বাস্তবায়নেও ধীরগতি আসতে পারে।

অন্যদিকে প্রশাসনে প্রায় সাড়ে ছয় শ কর্মকর্তা ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হয়ে আছেন। তাঁরা বেতন পাচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের অনেকের কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্ব নেই। আরও কিছু কর্মকর্তা এমন পদে আছেন, যেখানে কাজের পরিমাণ খুবই কম। ফলে একই প্রশাসনে একদিকে অতিরিক্ত কাজের চাপ, অন্যদিকে কাজহীন কর্মকর্তা। এটি কোনো সুস্থ প্রশাসনিক ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না।

এর পেছনে যে কারণটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তা হলো প্রশাসনে দলীয়করণ। সব রাজনৈতিক সরকারই কমবেশি প্রশাসনে নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্ব দিয়েছে। তবে গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এর মাত্রা অনেক বেড়েছিল। ক্ষমতা ধরে রাখার কাজে প্রশাসনের একটি অংশকে ব্যবহার করা হয়েছিল। 

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু পুরোনো সমস্যার সমাধান যদি নতুন রাজনৈতিক আনুগত্য দিয়ে করা হয়, তাহলে সমস্যার চরিত্র বদলাবে না। বরং তা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। আস্থাভাজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এবং অন্যদের ওএসডি বা কম গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা প্রশাসনকে নিরপেক্ষ করে না।

প্রশাসনের দক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে যোগ্যতা ও পেশাদারত্বকে বিবেচনা করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও একই কথা বলেছিল। দীর্ঘদিনের রাজনীতিকরণের কারণে জনপ্রশাসন তার গণমুখিতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা হারিয়েছে বলে কমিশন উল্লেখ করেছে। এই মূল্যায়ন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাকে একমাত্র মাপকাঠি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়। বর্তমান প্রশাসনে পদসংখ্যার চেয়ে কর্মকর্তা বেশি। তাহলে একজনকে একাধিক দায়িত্ব দেওয়ার যুক্তি কী?

সরকারের উচিত প্রশাসনকে ‘আস্থাভাজন’ ও ‘আস্থাভাজন নয়’—এভাবে ভাগ না করা। কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়; তাঁর দক্ষতা ও সততা বিবেচনা করা উচিত। যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর যোগ্য কর্মকর্তাদের যথাযথ দায়িত্ব দেওয়া হোক।

জনপ্রশাসন কোনো দলীয় প্রতিষ্ঠান নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। জনগণের অর্থে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানকে জনসেবার উপযোগী করাই সরকারের দায়িত্ব। কারও হাতে তিন দায়িত্ব আর কারও কোনো কাজ নেই—এই বৈপরীত্যের অবসান ঘটাতে হলে দলীয়করণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।